সৎকর্মশীল হওয়ার উপায়
প্রিয় ও পছন্দনীয় জিনিস দান না করলে কখনোই সৎকর্মশীল হওয়া যাবে না
“কস্মিণকালেও তোমরা কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যদি তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে তোমরা ব্যয় না কর!…”
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন,
لَن تَنَالُواْ الْبِرَّ حَتَّى تُنفِقُواْ مِمَّا تُحِبُّونَ وَمَا تُنفِقُواْ مِن شَيْءٍ فَإِنَّ اللّهَ بِهِ عَلِيمٌ
কস্মিণকালেও তোমরা কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যদি তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে তোমরা ব্যয় না কর। আর তোমরা যদি কিছু ব্যয় করবে আল্লাহ তা জানেন।
দান ও উদারতা ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা, যা কেবল দারিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যম নয়, বরং আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক উৎকর্ষ সাধনের একটি উপায়। সূরা আলে ইমরানের ৯২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তা’আলা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, প্রকৃত নেককার বা সৎকর্মশীল হতে হলে মানুষকে তার প্রিয় বস্তু থেকে দান করতে হবে। এই আয়াত দানের প্রকৃত উদ্দেশ্য, তার মানসিক ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব এবং এর সামাজিক প্রভাবকে তুলে ধরে।
এখানে ইসলামের দৃষ্টিতে দানের প্রকৃত রূপ বোঝানো হয়েছে—যেখানে শুধু অর্থ বা সম্পদ নয়, বরং আত্মার পরিশুদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। দানের মাধ্যমে মানুষ দুনিয়ার প্রতি অতি আসক্তি থেকে মুক্ত হয়ে উদারতা ও মানবপ্রেমের গুণাবলী অর্জন করতে পারে। তাই এই আয়াত আমাদের কেবল দান করার শিক্ষা দেয় না, বরং কীভাবে ও কোন মানসিকতা নিয়ে দান করা উচিত, তাও নির্দেশ করে।
১. নেককারদের স্তরে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় হলো প্রকৃত ভালোবাসার বস্তু থেকে নিঃস্বার্থ দান করা; শুধু নামাজ ও দোয়ার মাধ্যমে তা অর্জিত হয় না। “لَنْ تَنالُوا الْبِرَّ…”
২. ইসলামের দৃষ্টিতে দানের লক্ষ্য শুধুই দারিদ্র্য বিমোচন নয়; বরং দানকারীর আত্মগঠনও এতে গুরুত্বপূর্ণ। মিথ্যা মোহ থেকে মুক্ত হয়ে উদারতার গুণ বিকশিত হওয়া দানের অন্যতম বড় ফল। “لَنْ تَنالُوا الْبِرَّ”
৩. দুনিয়ার প্রতি অতি আসক্তি নেককার হওয়ার পথে প্রধান অন্তরায়। “لَنْ تَنالُوا الْبِرَّ”
৪. ব্যক্তির প্রকৃত কল্যাণ নিহিত রয়েছে তার উদারতা ও সমাজকল্যাণমূলক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে। “لَنْ تَنالُوا الْبِرَّ حَتَّی تُنْفِقُوا”
৫. মানুষের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ তার প্রাণ। তাই শহীদগণ, যারা আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন, তারাই সর্বোচ্চ নেককারের মর্যাদায় পৌঁছান। “تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ”
৬. যে বস্তুটি তুমি নিজে ভালোবাসো, তা দান করো; যা নিঃস্বরা ভালোবাসে, তা নয়। কারণ দরিদ্ররা দারিদ্র্যের চাপে ছোটখাটো জিনিসেও তুষ্ট হতে পারে। “مِمَّا تُحِبُّونَ”, “مما یحبون” বলা হয়নি।
৭. যে ব্যক্তি আল্লাহর গুণাবলী দ্বারা সত্যিকার অর্থে নিজের জীবন গঠন করে, সে সম্পদের দাস নয়, বরং সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণকারী হয়। “تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ”
৮. দানের ক্ষেত্রে পরিমাণ নয়, গুণগত মান গুরুত্বপূর্ণ। “مِمَّا تُحِبُّونَ” অর্থাৎ, কতটুকু দান করা হচ্ছে সেটা মূখ্য বিষয় নয়; বরং কেমন জিনিস দান করা হচ্ছে সেটাই হলো মূল বিষয়৷
৯. ইসলাম সম্পদপ্রীতির জীবন ব্যবস্থা নয়; এটি মানবপ্রেমের ওপর প্রতিষ্ঠিত। “تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ” পূজিবাদী সমাজব্যবস্থা হলো এর বিপরীত, একশ্রেণী সকল সম্পদ ভোগ করবে আর অপর শ্রেণী শোষিত ও নিষ্পেষিত হবে৷ ইসলাম এমনটি বলে না৷ ইসলামের নিয়ম হল সবাই সমানভাবে সম্পদ ভোগ করবে৷ যার আছে সে অন্য যার কিছু নেই বা অভাবী, তাকে দান করবে এবং সে নিজে যেমন জিনিস পছন্দ করে তেমন জিনিস দান করবে৷
১০. দানের ক্ষেত্রে অতিরিক্ততা বা কমতি কোনোটিই গ্রহণযোগ্য নয়; বরং ভালোবাসার বস্তু থেকে পরিমাণ মত একটি অংশ দান করো। “مِمَّا تُحِبُّونَ”
১১. মানুষের স্বভাবগতভাবেই সম্পদের প্রতি ভালোবাসা রয়েছে। “مِمَّا تُحِبُّونَ” কিন্তু ভয়ংকর হলো সেই ভালোবাসার মাত্রা, যা দান করতে বাধা দেয়। “وَ إِنَّهُ لِحُبِّ الْخَیْرِ لَشَدِیدٌ” (সুরা আদিয়াত: ৮)
১২. দানের পরিমাণ কম হলেও তা গুরুত্বপূর্ণ। “وَ ما تُنْفِقُوا مِنْ شَیْءٍ” একটি হলুদ শুকনো পাতাও পানিতে ভাসিয়ে শত শত পিঁপড়ার জন্য জীবন রক্ষার নৌকাতে পরিণত করা যেতে পারে।
১৩. যখন আল্লাহ আমাদের দান দেখছেন, তাহলে কেন আমরা তা কম বা নিম্নমানের করব? আসুন, আমরা উত্তম বস্তু দান করি। “فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِیمٌ”
প্রকৃত মুমিনদের দানের উদাহরণ
১. আবু তালহা আনসারি (রা.) মদিনার অন্যতম ধনী ব্যক্তি ছিলেন, যার ছিল প্রচুর খেজুর গাছ। তার সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ ছিল একটি সুসজ্জিত বাগান, যা মসজিদে নববীর বিপরীতে অবস্থিত ছিল এবং যেখানে স্বচ্ছ পানি প্রবাহিত হতো। রাসুলুল্লাহ (সা.) মাঝে মাঝে সেই বাগানে যেতেন এবং তার প্রস্রবণ থেকে পানি পান করতেন।
এই বাগান শুধু সৌন্দর্যের জন্যই প্রসিদ্ধ ছিল না, বরং এর আয়ও ছিল উল্লেখযোগ্য, যা নিয়ে লোকজন আলাপ করত। কিন্তু যখন আয়াত নাযিল হলো—”لَنْ تَنالُوا الْبِرَّ حَتَّی…” (তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা প্রিয় বস্তু থেকে দান করো), তখন আবু তালহা (রা.) নবীজীর (সা.) সেবায় হাজির হয়ে বললেন, “আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ এই বাগান। আমি চাই, এটি আল্লাহর রাস্তায় দান করি।”
রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, “এটি একটি চমৎকার বাণিজ্য! তোমার জন্য অশেষ শুভ কামনা। তবে আমি পরামর্শ দিই যে, তুমি এই বাগান তোমার দরিদ্র আত্মীয়স্বজনদের মাঝে বণ্টন করে দাও।”
আবু তালহা (রা.) নবীজীর পরামর্শ মেনে নিলেন এবং তার আত্মীয়দের মধ্যে বাগানটি বিতরণ করে দিলেন। (তাফসীরে কাবির, মাজমাউল বায়ান, সহীহ বুখারি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৮১)
দান ও উদারতা একজন মুমিনের ঈমানের পরিপূর্ণতার অন্যতম নিদর্শন। সূরা আলে ইমরানের ৯২ নম্বর আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয় যে, প্রকৃত পুণ্য অর্জনের জন্য কেবল দান করাই যথেষ্ট নয়, বরং নিজের প্রিয় বস্তু থেকে দান করাই আসল পরীক্ষার বিষয়। আবু তালহা আনসারি (রা.)-এর দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে যে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ উৎসর্গ করেন, তারা শুধু দুনিয়াতেই সম্মানিত হন না, বরং আখিরাতেও অসীম পুরস্কারের অধিকারী হন। অতএব, আসুন আমরা দানের আসল অর্থ ও তাৎপর্য হৃদয়ে ধারণ করি এবং আল্লাহর পথে উদারতা প্রদর্শন করি।
লেখা: নাজমুল হক (কোম, ইরান)
Viewed 160 times