শবে বরাত মহিমান্বিত এক রজনী

মাও.মুফতি মোহাম্মাদ উল্লাহ্ খতীব:- চকলোকমান কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ বগুড়া সদর, বগুড়া : আল্লাহ তা’আলা পরম দয়ালু। অসীম মেহেরবান। তিনি উদার ক্ষমাশীল। ক্ষমা আল্লাহর শ্রেষ্ঠ গুণ। ক্ষমা করার জন্য ক্ষমা প্রার্থীর আবেদনের অপেক্ষায় থাকেন তিনি। আল্লাহ বাতলে দিয়েছেন এর অসংখ্য পথ ও পাথেয়। স্বীয় বান্দাদেরকে প্রদান করেছেন তিনি ক্ষমার সুবর্ণ সুযোগ আর বিশাল বিশাল অফার। বরাদ্দ করেছেন ক্ষমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সময়। যে সময়ে তিনি মহা পাপীদের মুক্তি দেন, মর্যাদা বাড়িয়ে দেন- বাড়িয়ে দেন ভালো কাজের বিনিময় অনেক অনেক গুণে। মুছে দেন পাপীদের সকল কালিমার চিহ্ন। এই মহা অফারসমূহের অন্যতম একটি অফার হলো শবে বরাত। শবে বরাতে মুক্তি ও রহমতের দ্বার উন্মুক্ত থাকে শবে বরাত একটি মহিমান্বিত রজনী। এই রজনীতে পরম করুণাময় তাঁর রহমতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন। পাপীদেরকে উদার চিত্তে ক্ষমা করেন। এ মর্মে একটি সহীহ হাদীস বর্নিত আছে “হযরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, “আল্লাহ তা’আলা অর্ধ শাবানের রাতে (শাবানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে) সৃষ্টিকুলের প্রতি (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন। “সহীহ ইবনে হিব্বান” (১২/৪৮১, হাদীস নং ৫৬৬৫) ইমাম তাবরানী, কাবীর (২০/১০৯ হা. নং ২১৫), আওসাত (৭/৬৮ হাদীস নং ৬৭৭৬), বায়হাকী, শুয়াবুল ঈমান (৫/২৭২ হা. নং ৬৬২৮) হাদীস বিশারদগন ও নির্ভরযোগ্য সব উলামায়ে কেরামের গবেষণা মতে এ হাদীসটি ‘সহীহ’ বিশুদ্ধ। উল্লিখিত বিষয়ে প্রায় এক ডজনের বেশি হাদীস নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহে সংকলন করা হয়েছে। তন্মধ্যে কয়েকটি আছে সহীহ। কয়েকটি আছে ‘হাসান’ (গ্রহণযোগ্য উত্তম হাদীস) এ ছাড়া কিছু আছে দুর্বল। কিন্তু হাদীসের নীতিমালা অনুযায়ী হাদীস গ্রহণযোগ্য। এ মর্মে যেসব সাহাবায়ে কেরাম থেকে হাদীস বর্ণিত আছে তাঁদের অন্যতম কয়েকজন হলেন, হযরত মুআয ইবনে জাবাল(রা.), হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা.), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.), হযরত আয়েশা (রা.), হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা.), হযরত আবূ সা’লাবা (রা.), হযরত আবূ হুরায়রা (রা.), হযরত আউফ ইবনে মালেক (রা.), হযরত কাসীর ইবনে মুররাহ (রা.) হযরত উসমান ইবনে আবীল আস (রা.) এবং হযরত আলী ইবনে আবী তালেব (রা.)। উপরোল্লিখিত হাদীসটি যেসব বিশ্ব বরেণ্য হাদীস বিশারদ ইমামগণ সহীহ বলে আখ্যায়িত করেছেন তাদের অন্যতম হলো, আরব বিশ্বের শ্রেষ্ঠ গবেষক ও মান্যবর ইমাম হাফেজ নূরুদ্দীন হায়সামী (রহ.)। তিনি তাঁর নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ “মাজমাউয যাওয়ায়েদ”-এ লেখেন “ইমাম তাবরানী স্বীয় হাদীস গ্রন্থ ‘কাবীর’ ও ‘আওসাত’-এ হাদীসটি সংকলন করেছেন। উভয় গ্রন্থে এ হাদীসের বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য।” মাজমাউল যাওয়াইদ ৮/৬৫
শবে বরাতে রাত জেগে ইবাদত করা ও পরদিন রোযা রাখা
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক রাতে রাসূলুল্লাহ (সা.) নামাযের জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন। এতে তিনি এমন দীর্ঘ সেজদা করলেন যে, আমার ধারণা হলো তিনি মারাই গিয়েছেন। আমি যখন অবলোকন করি, তখন বিছানা থেকে উঠে নবীজী (সা.)-এর বৃদ্ধাঙ্গুলিতে নাড়া দিই। এতে করে তাঁকে সচেতন বুঝতে পারি, আমার বিশ্বাস হলো তিনি জীবিত আছেন। অতঃপর নিজ বিছানায় ফিরে এলাম। তিনি সেজদা থেকে মাথা উঠালেন। নামায সমাপ্ত করে তিনি আমাকে বললেন, হে আয়েশা! তোমার কী ধারণা হয়েছে? নবী কী তোমার সাথে সীমালঙ্ঘন করেছে? আমি বলি, না, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) তবে আপনার দীর্ঘ সেজদার কারণে আমার মনে হয়েছে আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন। অতঃপর নবীজী (সা.) বললেন, হে আয়েশা! তুমি কি জানো আজকের এ রাতটি কোন রাত? আমি বললাম আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) এ বিষয়ে অধিক জ্ঞান রাখেন। নবীজী (সা.) বললেন, “এ রাতটি মধ্য শাবানের রাত (শবে বরাত)। এ রাতে আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ করুণার দৃষ্টি দেন, অনুগ্রহপ্রার্থীদের দয়া করেন, তবে হিংসুক ব্যক্তিদের স্বীয় অবস্থার ওপর ছেড়ে দেন।” বায়হাকী শুআবুল ঈমান ৩/৩৮৩, হা. ৩৮৩৫, আততারগীব ওয়াত তারহীব ২/৭৩-৭৪
ইমাম বায়হাকী (রহ.) উল্লিখিত হাদীসটি সংকলন করেছেন। তিনি এ হাদীসটি সম্পর্কে গ্রহণ করার মতো উত্তম মুরসাল হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। সাথে সাথে শবে বরাতের ফযিলতপূর্ণ অন্যান্য হাদীসের সমন্বয়ে এই হাদীসটির গ্রহণযোগ্যতা আরো বৃদ্ধি পাবে। সুনানে ইবনে মাজায় হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন পনেরো শাবানের রাত যখন আসে, তোমরা এই রাতটি ইবাদত বন্দেগীতে পালন করো এবং দিনের বেলা রোযা রাখো। কেননা, এ রাতে সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তা’আলা প্রথম আসমানে আসেন আর বলেন, “কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। কোনো রিযিক অন্বেষণকারী আছে কি? আমি তাকে রিযিক প্রদান করব। আছে কি কোনো রোগাক্রান্ত? আমি তাকে আরোগ্য দান করব। এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত আল্লাহ তা’আলা মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে তাদের ডাকতে থাকেন।” সুনানে ইবনে মাজাহ পৃ. ৯৯ হা. ১৩৮৮, বায়হাকী শুআবুল ঈমান ৩/৩৭৮ হা. ৩৮২২
হাদীস বিশারদ ইমামগণের গবেষণা মতে এ হাদীসের সব বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য। তবে এতে শুধু ইবনে আবী সাবূরা নামক এক ব্যক্তি রয়েছে, তার স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার কারণে হাদীসটি আংশিক সামান্য দুর্বল বলে গণ্য হবে। এ ধরনের দুর্বল হাদীস ফাযায়েলের ক্ষেত্রে সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণযোগ্য শবে বরাত শীর্ষক হাদীসগুলোকে সমষ্টিগতভাবে হাদীস বিশারদ ইমামগণ বিশুদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন, তাই এ হাদীসটিও গ্রহণযোগ্য হবে।
শবে বরাতে যা বর্জনীয়:
এ রাতে নির্দিষ্ট কোনো আমল বা নির্দিষ্ট সংখ্যায় কোনো কাজকর্ম কুরআন বা হাদীসে বর্ণিত নেই। নামাযের কোনো নির্দিষ্ট রাক’আত সংখ্যাও বর্নিত নেই, বা ভিন্ন কোনো পদ্ধতির কথা কোন স্থানে উল্লেখ নেই। এ রাতে নামায, দু’আ ও কুরআন তিলাওয়াত দান,সদাকা ইত্যাদি নফল আমলের অন্তর্ভুক্ত। আর যাবতীয় নফল আমল আপন আপন ঘরে একাগ্রচিত্তে পড়া বা করা উত্তম। তাই এ রাতে নফল নামায আদায়ের জন্য দলে দলে মসজিদে যাওয়া, মসজিদে জমকালো আনুষ্ঠানিকতা সৃষ্টি করা ঠিক নয়। তবে কোনো ধরনের আয়োজন ও আনুষ্ঠানিকতা ব্যতীত মসজিদ নামাযের স্থান হিসেবে এতে সমবেত হয়ে গেলে কোনো আপত্তির কারণ নেই। অনুরূপভাবে হালুয়া-রুটি, মিষ্টি বিতরণ এবং বাসাবাড়ি, মসজিদ, দোকান, অফিস ইত্যাদিতে আলোকসজ্জা করা, পটকাবাজি, আতশবাজি, কবরস্থানে ফুল অর্পণ ও আলোকসজ্জা করা ইত্যাদির কোনো শরয়ী ভিত্তি নেই। সাহাবায়ে কেরাম রা. বা নির্ভরযোগ্য কোনো উলামায়ে কেরামের অনুসৃত আমলের প্রমাণ নেই। তাই এ সব কুসংস্কার পরিপূর্ণরূপে পরিহার করা আমাদের অত্যন্ত জরুরি।
এ রাতে কবর যিয়ারতের বিধান:
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে এক রাতে বিছানায় পাইনি। তখন খোঁজ করার জন্য বের হয়ে তাঁকে জান্নাতুল বাক্বীতে (কবরস্থানে) পাই। (এমতাবস্থায় কথা প্রসঙ্গে) তিনি বলেন “মধ্য শাবান বা শাবানের পনেরো তম রাতে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে আগমন করেন এবং বনু কালব গোত্রের ছাগল ভেড়ার পশমের চেয়েও অধিক সংখ্যক লোককে তিনি ক্ষমা করে দেন।” সুনানে তিরমিযী, খ.১/পৃ.১৫৬ হা. ৭৩৯, ইবনে মাজাহ-পৃ. ৯৯ হা. ১৩৮৯ হাদীসটির মূল সূত্রে এক স্থানে ধারাবাহিকতা ছিন্ন হয়েছে। তবে পূর্বে উল্লেখিত শবে বরাত সম্পর্কীত অসংখ্য হাদীসের সমন্বয়ে সমষ্টিগত ভাবে হাদীসটি সহীহ পর্যায়ের বলে গণ্য হবে। তাই হাদীসটি গ্রহণযোগ্য ও আমলযোগ্য। এ হাদীসে বিশেষভাবে লক্ষণীয় একটি বিষয় হলো, রাসূলুল্লাহ (সা.) শবে বরাতে জান্নাতুল বাক্বীতে (কবরস্থানে) গিয়েছিলেন। এতে কবরস্থানে যাওয়া এ রাতের একটি উল্লেখযোগ্য আমল হিসেবে প্রমাণ বহন করে। তবে উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) এ রাতে কবরস্থানে গিয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু তিনি তো একাকী গিয়েছিলেন। গিয়ে ছিলেন নির্জনে অনানুষ্ঠানিকভাবে। তাই কবর যিয়ারতের নামে দলবদ্ধ হওয়া,বা সংঘবদ্ধ হওয়ার জন্য আহ্বান করা, জমকালো অনুষ্ঠানে পরিণত করা, কবরে আলোকসজ্জা করা, আতশবাজি, পুষ্প অর্পণে লিপ্ত হওয়া, নারী-পুরুষের মিলনমেলায় পরিণত করা ইত্যাদি শবে বরাতের নামে বাড়াবাড়ি ও ধর্মবিকৃতির নামান্তর। এ সবই ইসলামী আদর্শ বিবর্জিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবাগণের অনুসৃত আমল থেকে দূরে-অনেক দূরে। তাই শরীয়তের যাবতীয় ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি ও চরমপন্থা পরিহার করে শরীয়তকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রত্যেকের জন্য অপরিহার্য। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক ভাবে বুঝে আমল করার তৌফিক দান করুন। এবং শাবান মাসে সবধরনের গুনাহ ও পাপাচার হতে মুক্ত থেকে এ মাসের যথাযথ মূল্যায়ন এবং কল্যাণ লাভে সবাইকে ধন্য করুন।
আমিন
Viewed 60 times