মাদকের সহজলভ্যতাই কি যুবসমাজ ধ্বংসের মূল কারণ!!
সম্পাদকীয়ঃ বর্তমানে আমাদের যুব সমাজ অসংখ্য সংকট ও সমস্যায় জর্জরিত।এ সব সংকট ও সমস্যার মধ্য হতে অন্যতম সংকট ও সমস্যা হলো মাদক সেবন ও নেশা করা। ইসলামে সব ধরনের মাদকদ্রব্য নিষিদ্ধ হলেও ধর্মীয় মূল্যবোধ হারিয়ে যুব সমাজ মাদকের মরণ নেশায় মেতে উঠেছে।বাংলা ‘নেশা’ শব্দটি মূলত ফার্সি শব্দ ‘নাশাতুন’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ হচ্ছে ‘মত্ততা’। বর্তমান সময়ে অধিকাংশ যুব সমাজ মাদক-আক্রান্ত হয়ে ধ্বংসের অবলীলায় নিপতিত হতে দেখা যায়। বিভিন্ন ধরনের মাদকের সয়লাব যুবকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়াতে তারা কোনো না কোনো উপায়ে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।মাদক বর্তমানে এত বেশি ব্যাপক আকার ধারণ করছে,যার ভয়ানক প্রভাব ও বিস্তার লক্ষ্য করা যায় আমাদের মানুষ গড়ার আঙ্গিনা-শিক্ষাঙ্গনগুলোতেও। এটি বর্তমান সময়ে যুব সমাজের জন্য একটি ভয়ানক পরিণতি ও অশনি সংকেত। তাই, বর্তমানে যদি একজন যুবক নষ্ট হয়ে যাওয়ার আগে তাকে সঠিক পথে রাখার জন্য কিংবা মাদক থেকে দূরে রাখার জন্য সময়মত সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করা হয়, তাহলে যুব সমাজের কাছে জাতির যে প্রত্যাশা তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হতে বাধ্য।
বিজ্ঞাপন
যুব সমাজ ধ্বংস ও তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের প্রধান অন্তরায় মাদক। মাদক শুধু একজন যুবকের মেধা ও সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের প্রতিবন্ধক নয় বরং মাদক একজন যুবককে ধ্বংসের অবলীলা ও মারাত্মক পরিণতির দিক ঠেলে দিয়ে তাকে চিরতরে ধ্বংস ও অকেজো করে দেয়। তার মূল্যবান জীবনটা নষ্ট হয়ে যায়।
মূলত,মাদকের সহজলভ্যতা একটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করে যা অন্যান্য সামাজিক ও ব্যক্তিগত সমস্যাগুলোকে আরও জটিল করে তোলে।যুব সমাজকে এই ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে শুধুমাত্র মাদকের সহজলভ্যতা রোধ করাই যথেষ্ট নয়, বরং একটি সুস্থ সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এবং যুবকদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।বেকারত্ব এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা থেকে সৃষ্ট হতাশা যুবকদের মাদকের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার একটি বড় কারণ।
বিজ্ঞাপন
সুস্থ পারিবারিক পরিবেশের অভাব,বাবা-মায়ের ব্যস্ততা এবং সামাজিক অবক্ষয় যুবকদের বিপথে পরিচালিত করে। মাদকের সহজ প্রাপ্তি এই অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে।আধুনিক জীবনের মানসিক চাপ, হতাশা এবং একাকীত্ব থেকে মুক্তি পেতে যুবকরা মাদকের দিকে ঝুঁকতে পারে। সহজলভ্যতার কারণে এই প্রবণতা বাড়ে।অনেক ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শিথিলতা বা দুর্নীতির কারণে মাদকদ্রব্য হাতের নাগালে থাকে,যা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে।
বিজ্ঞাপন
ইসলামি মূল্যবোধ বান্ধব সমাজ ব্যবস্থা ছাড়া সব সমাজেই মাদকের ছুটাছুটি পরিলক্ষিত। মুসলিম পারিবারিক বন্ধন ও ইসলামি মূল্যবোধ কম-এমন পরিবারের সদস্যরা অতি সামান্য কারণে মাদকদ্রব্যে অধিকতর আসক্ত হচ্ছে। যারা নেশা করে তাদের অধিকাংশই জানে, নেশা কোনও রকম উপকারী বা ভালো কাজ নয় এবং তা মানুষের জীবনীশক্তি বিনষ্ট করে। এসব জেনেশুনেও মাদকাসক্ত মানুষ নেশার অন্ধকার জগতের মধ্যে থাকতে চায়। মাদকাসক্ত তরুণ প্রজন্ম ধর্ম-কর্ম সবকিছু বিসর্জন দিয়ে হতাশাকে সঙ্গী করে জীবনের চলার পথ থেকে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে এবং বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে সামাজিকতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ইসলাম মানুষকে নেশা গ্রহণ ও মাদক সেবন হতে সম্পূর্ণ নিষেধ করে। মানুষকে ধ্বংস ও করুণ পরিণতি হতে রক্ষা করার জন্য ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার কোনো বিকল্প নাই। তাই আমাদের জানতে হবে ইসলাম মাদক সম্পর্কে কি দিক-নির্দেশনা দেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন,নেশাজাতীয় যেকোনো দ্রব্যই মাদক, আর যাবতীয় মাদকই হারাম, যে ব্যক্তি দুনিয়াতে মাদক সেবন করে, অতপর নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মারা যায় এবং সে তাওবা না করে, আখিরাতে সে মদ পান করা হতে বঞ্চিত হবে’।
বিজ্ঞাপন
মানবসভ্যতার প্রতি মারাত্মক হুমকি সৃষ্টিকারী দেশের অন্যতম অভিশাপ মাদকাসক্তি। মাদকদ্রব্যের নেশার ছোবল এমনই ভয়ানক যে তা ব্যক্তিকে পরিবার, সমাজ, দেশ থেকেই বিচ্ছিন্ন করে না; তা সমগ্র জীবন ধ্বংস করে দেয়। মাদক কেবল সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্রেরই ক্ষতি করে না; সভ্যতা ও সংস্কৃতিকেও বিপন্ন করে। পরিমাণে অল্প হোক আর বেশি হোক-পান বা অন্য কোনোভাবে গ্রহণ করা হোক, নেশা ও চিত্ত-বিভ্রমক হলেই তা ইসলামে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। মানবতার মুক্তির কাণ্ডারি ইসলামই সর্বনাশা মাদক সম্পর্কে মানব জাতিকে সর্বোচ্চ সতর্ক করছে। মানুষ যাতে মাদক থেকে দূরে থাকে তার জন্য মাদক সেবনে এ নেশাগ্রস্থ ব্যক্তির জন্য শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন।
বিজ্ঞাপন
এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হয়েছে,ওহে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্য নির্ণায়ক তীর হচ্ছে ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কারসাজি। সুতরাং, তোমরা এসব বর্জন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার”।
মাদক হলো এমন এক ধরনের অবৈধ ও বর্জনীয় বস্তু, যা গ্রহণ বা সেবন করলে আসক্ত ব্যক্তির এক বা একাধিক কার্যকলাপের অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা বিকৃতি ঘটতে পারে। মাদকাসক্তিতে মানুষের কোনও না কোনও ক্ষয়ক্ষতি তো হয়ই এবং ধীরে ধীরে তা নেশাগ্রস্ত ব্যক্তিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। মাদক কেবল একক অপরাধ নয়, মাদকাসক্তির সঙ্গে সন্ত্রাস ও অন্যান্য অপরাধ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।
বিজ্ঞাপন
সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গসহ সকল শ্রেণীর ধর্মপ্রাণ লোক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে মাদকদ্রব্যের প্রসার রোধে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা চালালে দেশ থেকে মাদকদ্রব্যের ব্যবহার চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। এ ব্যাপারে ইসলামে কঠোর শাস্তির বিধান আছে। ইহকাল ও পরকালে মাদকাসক্তির ভয়াবহতা জনগণের সামনে তুলে ধরার পরও যারা এ ভয়ঙ্কর নেশা ছাড়ে না তাদের জন্য আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দণ্ডবিধি প্রবর্তন করেছেন, যাতে তারা সংশোধিত হয় এবং অন্যরা শিক্ষা নিতে পারে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইসলামী মূল্যবোধে উজ্জীবিত হওয়ার শিক্ষাই মাদকের সর্বনাশা অভিশাপ থেকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তরুণদের রক্ষা করতে পারে।
অতএব, ধর্মভীরু মা-বাবা ও অভিভাবকদের উচিত সর্বনাশা মাদকের কুফল ও ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সন্তানদের সচেতন করা। তাহলেই মাদকাসক্ত সন্তানদের নিয়ে মা-বাবার সমস্যা অনেক কমে যাবে। মা-বাবা ও অভিভাবকেরা, নিজেদের সন্তানদের সামনে ধর্মীয় রীতিনীতি, ইসলামি মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতার সুন্দর আদর্শ তুলে ধরুন। কারণ তারাই একদিন সমাজ-সংসার তথা দেশের কর্ণধার হবে। প্রত্যেক অভিভাবকের উচিত, তাদের সন্তান যাতে কোনও অসৎ সংস্রবে পড়ে মাদকাসক্ত না হয় সেদিক সজাগ দৃষ্টি রাখা। এ ক্ষেত্রে পারিবারিক শৃঙ্খলা, সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক, সর্বোপরি মানসিক বিকাশের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
বিজ্ঞাপন
মাদক ত্যাগের ব্যাপারে আসক্ত ব্যক্তিদেরও আত্মপ্রত্যয়ী হওয়া দরকার। মাদক থেকে বিরত থাকার জন্য নিজস্ব উদ্যোগই সবচেয়ে ভালো। নিজ থেকে নেশা ছাড়া সম্ভব না হলে তাদের ইসলামি মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করতে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্র প্রদত্ত সহযোগিতা গ্রহণ করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম ও যুব সমাজে মাদকাসক্তির নেশায় যে নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের সৃষ্টি হয়েছে তা কেবল ইসলামি মূল্যবোধই প্রতিরোধ করতে পারে। আসক্তদেরকে মাদক ত্যাগে উৎসাহিত করতে সর্বস্তরের জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে।হাদিসে মাদকের সেবনের বিভিন্ন পরিণতির কথা উল্লেখ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের অন্তরে মাদকের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করেছেন এবং বিভিন্ন প্রকার শাস্তি ও আযাবের কথা উল্লেখ করে মানুষকে সর্তক করেছেন। যেমন-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদকের বিস্তারকে কিয়ামতের আলামত বলে আখ্যায়িত করেন।
_মোঃআশিকুর রহমান সুজন।
সম্পাদকঃ-দৈনিক আমার ভাষা।
Viewed 5750 times