চয়ন রাজভর হত্যাকান্ডের বিচারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন
প্রেস বিজ্ঞপ্তিঃ ‘বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী অধিকার আন্দোলন (বিডিইআরএম)’- বগুড়া জেলা শাখার পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানবেন।
আপনারা নিশ্চয়ই জেনে থাকবেন যে, সম্প্রতি বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটফুলবাড়ী বাজারে ভূমি বেদখলের প্রতিবাদ করতে গিয়ে কোচিং সেন্টারের পরিচালক, দলিত যুবক চয়ন রাজভর (চয়ন কুমার রায়) নামক এক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার পর হত্যাকান্ডের শিকার চয়ন রাজভরের ভাই প্রদীপ রায় বাদী হয়ে সারিয়াকান্দী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। যার নম্বর ০৯ (০৭ মার্চ ২০২৬)। এরই মধ্যে ঘটনার তথ্যানুসন্ধান করতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও ভূক্তভোগী পরিবারের সাক্ষাৎকার গ্রহন করেছে বিডিইওএম ও মানবাধিকার সংগঠন ‘নাগরিক উদ্যোগ’ এর প্রতিনিধিবৃন্দ।
ভূক্তভোগী ও মামলা সূত্রে জানা গেছে, সারিয়াকান্দী উপজেলার ফুলবাড়ী মৌজায় ফুলবাড়ী তেতুলতলা নামক স্থানে দাগ নম্বর ১৯৪৬ তে ০৩.১০ একর জমি স্থানীয় রাজভর সম্প্রদায়ের পৈত্রিক সম্পত্তি। বর্ণিত সম্পত্তির ভোগ দখলের বিষয় নিয়ে আসামিদের সাথে দীর্ঘদিন যাবৎ বিবাদ রয়েছে। উভয়পক্ষ বিজ্ঞ আদালতে মোকদ্দমা দায়ের করলে উভয় পক্ষের মোকদ্দমা বিজ্ঞ আদালতে চলমান রয়েছে। এমতাবস্থায় বর্ণিত আসামীগণ পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ০৬ মার্চ ২০২৬ শুক্রবার রাত আনুমানিক ৯.১৫ টায় এজাহার নামীয় আসামিগণ পূর্বপরিকল্পিতভাবে বেআইনী জনতায় দলবদ্ধ হয়ে হাতে ধারালো চাকু, লোহার রড, বাঁশের লাঠি ইত্যাদি নিয়ে বর্নিত সম্পত্তিতে অনধিকার প্রবেশ করে। উক্ত আসামিগণ বর্ণিত সম্পত্তির উপর ঘর তৈরীর প্রস্তুতি গ্রহণ করলে বাদীর ভাই নয়ন রাজভর (৩৪) ও চয়ন রাজভর (৩২) দ্বয় জমিতে গিয়ে আসামিদের ঘর তৈরীর কারণ জিজ্ঞাসা করলে আসামিগণ তাদের প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে গালিগালাজ করে এবং ১ নম্বর আসামির হুকুমে এজাহার নামীয় গ্রেফতারকৃত ৩ নম্বর আসামি রাব্বি ফকিরের হাতে থাকা ধারালো অস্ত্র চাকু দ্বারা চয়ন রায়কে হত্যার উদ্দেশ্যে বুকে আঘাত করে কাটা রক্তাক্ত গুরুতর যখম করে। ৪ নম্বর আসামির হাতে থাকা ধারালো চাকু দ্বারা চয়নকে হত্যার উদ্দেশ্যে বুকের বাম পাশে আঘাত করে কাটা রক্তাক্ত গুরুতর জখম করে। চয়ন মাটিতে পরে গেলে ১ নম্বর আসামি শাহীন ও ২ নম্বর আসামি আমিনুর দ্বয়ের হাতে থাকা লোহার রড দ্বারা চয়নের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে যখম করে। আসামি রাকিব চয়নের পেটে লাথি মারতে থাকে। আসামি নুর নবী জনি চয়নকে হত্যার উদ্দেশ্যে গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে। আসামি তাহের ও ফাইনাল দ্বয়সহ অজ্ঞাতনামা আসামিগণের হাতে থাকা বাঁশের লাঠি দ্বারা চয়নের শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারপিট করে ফোলা যখম করে। চয়নের ভাই নয়ন এগিয়ে গেলে ৭ নম্বর আসামি রাকিবের হাতে থাকা ধারালো চাকু দ্বারা নয়নকে হত্যার উদ্দেশ্যে পেটে আঘাত করতে আসে। সে ডান হাত দ্বারা ঠেকালে উক্ত আঘাত ডান হাতের বাহুতে লেগে কাটা রক্তাক্ত গুরুতর জখম করে।
নয়ন রাজভর মাটিতে পরে গেলে আসামী শাহীন, আমিনুল ও তাহেরগণ নয়নের হাতে, পায়ে, পিঠে ও বুকেসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাথাড়িভাবে আঘাত করে ফেলা কালো শিরা জখম করে। আসামি নুর নবী নয়নের বাম চোখের চোখের নিচে ঘুসি মেরে কালো শিরা জখম করে। বাদী শ্রী প্রদীপ রায় নিজেই এগিয়ে গেলে আসামি তাহের ও ফাইন ঘয়ের হাতে থাকা বাঁশের লাঠি দ্বারা বাদির হাতে, পায়ে, পিঠে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে ফোলা কালো শিরা জখম করে। বাদীর কাকাতো ভাই পল্টন রাজভর এগিয়ে গেলে আসামিগণ তাকেও মারপিট করে ফোলা কালো শিরা
জখম করে। জখমীদের ডাক চিৎকারে আশেপাশের লোকজন আসলে আসামিগণ পরবর্তীতে সুযোগ মতো পেলে কুপিয়ে হত্যা করবে মর্মে হুমকি ধামকি দিয়ে চলে যায়। বাদীর ভাই চয়ন ও নয়ন দ্বয়কে রাস্তায় চলাচলের অজ্ঞাত সিএনজি যোগে উক্ত তারিখ রাত ৯.৪৫ টায় সারিয়াকান্দী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক চয়নকে মৃত ঘোষণা করেন এবং নয়নের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল হাসপাতাল, বগুড়ায় রেফার্ড করেন। এবং চয়নের মৃত দেহের সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করে ময়নাতদন্তের জন্য শজিমেক হাসপাতাল মর্গে প্রেরন করে। উক্ত বিষয়ে সারিয়াকান্দী খানা পুলিশকে সংবাদ দিলে থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মের নুর আলম ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় আসামীগণকে গ্রেফতার করেন। এসময় চয়নকে হত্যার কাজে ব্যবহৃত আসামী রাব্বী ফকিরের হেফাজত হতে একটি রক্তমাখা বার্মিজ চাকু উদ্ধার করে। এপর্যন্ত ৫ জন আসামী গ্রেফতার হলেও বাঁকিরা ধরাছোয়ার বাইরে।
আমরা এটিকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং পুরোপুরিভাবে অবৈধ ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত সহিংসতা বলে মনে করছি। ভূক্তভোগী পরিবারগুলো সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক অনগোষ্ঠীর হওয়ায় তাদের জমি বেদখলপূর্বক উচ্ছেদের লক্ষ্যে নানাভাবে হীন প্রচেষ্টা চালাতে থাকে আসামীরা। কখন্যে প্রাণনাশের হুমকি, কখনো মিথ্যা মামলা আবার কখনো বিভিন্নভাবে হয়রানির মাধ্যমে রাজভর পরিবারকে কোনঠাসা করতে থাকে। আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে আনাচ্ছি যে, সমাজের অত্যন্ত পিছিয়েপড়া রাজভর জনগোষ্ঠীর উপর ন্যাক্কারজনক এহেন ঘটনা সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, ফেলবে। আমরা মনে করি, এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের সামিল, যা বাংলাদেশের সংবিধান, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। এ ঘটনার বিচার নিশ্চিতের পাশাপাশি ভূক্তভোগীদের সার্বিক নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, ভূক্তভোগী রাজভর জনগোষ্ঠীর সদস্যরা এ দেশেরই নাগরিক, এবং তাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার একটি মৌলিক মানবাধিকার। তাদের জীবন, অস্তিত্ব এবং সম্মান রক্ষা করা রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। আমরা মানবাধিকার সংগঠন, নাগরিক সমাজ এবং সংবাদমাধ্যমের সহায়তা কামনা করছি। যাতে এই মানুষগুলির কণ্ঠ রোধ না হয় এবং তাঁদের ন্যায্য অধিকার রক্ষিত হয়। আমরা সরকারের কাছে সংবেদনশীল, মানবিক ও কার্যকর পদক্ষেপের প্রত্যাশা করছি। এই প্রেক্ষাপটে আমরা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নিম্নোক্ত দাবিনামা উত্থাপন করছি।
Viewed 2200 times


