নিরাপত্তাহীন গণমাধ্যম ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ
সম্পাদকীয়ঃ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত গণমাধ্যম আজ এক গভীর সংকটের মুখে।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক হামলা,মিথ্যা মামলা এবং পেশাগত কাজে বাধার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।গত ১৬ মাসে অন্তত ১,১৪৪ জন সংবাদকর্মী নানাভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে তথ্য প্রকাশ করেছে সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল।
পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে,২০২৫ সালকে সাংবাদিকদের জন্য অন্যতম অনিরাপদ বছর হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে,যেখানে অন্তত ৩ জন সাংবাদিক নিহত এবং শতাধিক গুরুতর আহত হয়েছেন।
২০২৬ সালের ০৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার শাহবাগ ও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল সংলগ্ন এলাকায় ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচি এবং সরকারি কর্মচারীদের আন্দোলন চলাকালীন সাংবাদিক ও পুলিশের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটেছে।এই ঘটনার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক সমালোচনা ও উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে।
নিহত ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির হত্যার বিচারের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চ এবং ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে সরকারি কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ‘যমুনা’ অভিমুখে যাত্রা করলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ বাধে।পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের লাঠিচার্জে কালের কণ্ঠ যুগান্তর,দেশেরপত্র,ভিউজ বাংলাদেশ এবং চ্যানেল ওয়ানসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের অন্তত ১৫ জন সাংবাদিক আহত হন।
বিশেষ করে,পুলিশ সদস্য জাহিদ কর্তৃক সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে অতর্কিত হামলার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র নিন্দা শুরু হয়।
বর্তমানে গণমাধ্যমকর্মীরা কেবল রাজপথেই নয়, বরং ডিজিটাল জগতেও হুমকির সম্মুখীন। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে গিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আক্রোশের শিকার হওয়া এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।গাজীপুরে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে নৃশংসভাবে হত্যা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যম কার্যালয়ে ‘মব’ হামলা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখা দিচ্ছে ।এছাড়া, রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে গণহারে হত্যা মামলা দায়েরের যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছে, তা পেশাদারিত্বকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
কেবল বাহ্যিক আক্রমণ নয়,গণমাধ্যমকর্মীরা অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অনিশ্চয়তায়ও ভুগছেন।গত দেড় বছরে অন্তত ১৮৯ জন সাংবাদিক চাকরিচ্যুত হয়েছেন এবং অনেক প্রতিষ্ঠানে জোরপূর্বক নেতৃত্বের রদবদল ঘটানো হয়েছে।সাইবার সিকিউরিটি অর্ডিন্যান্সের মতো আইনগুলো সংস্কারের কথা থাকলেও তার কিছু ধারা এখনো মুক্ত সাংবাদিকতার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুরক্ষার দাবি ও আগামীর পথে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন ‘সাংবাদিকতার অধিকার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে,যেখানে সাংবাদিকদের ওপর হামলায় কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
তবে কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়,প্রয়োজন এর সঠিক বাস্তবায়ন এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান।সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো করুণা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। একটি স্বাধীন ও নির্ভীক গণমাধ্যম ছাড়া সুশাসন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। তাই রাষ্ট্র ও সমাজকে আজ একযোগে সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কলমের সৈনিকরা আর কোনো পরিস্থিতিতেই নির্যাতনের লক্ষ্যবস্তু না হন।
Viewed 4250 times