নিরপরাধ মানুষের জীবনে মামলা বাণিজ্যের থাবা
সম্পাদকীয়ঃ
বর্তমান বাংলাদেশে ‘মামলা বাণিজ্য’ একটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে অনেক নিরপরাধ ও সাধারণ মানুষ প্রতিহিংসামূলক বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার শিকার হচ্ছেন।এই পরিস্থিতির ওপর একটি সম্পাদকীয় প্রতিবেদনের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হল।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে এক ভয়াবহ সামাজিক ও আইনি ব্যাধি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘মামলা বাণিজ্য’। বিশেষ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে ঢালাওভাবে মামলা দায়েরের একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এসব মামলায় প্রকৃত অপরাধীদের পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে এমন সব সাধারণ মানুষের, যাদের ঘটনার সঙ্গে কোনো দূরতম সম্পর্কও নেই।
বর্বাতমানে এটি একধরনের বাণিজ্যের রূপরেখায় পরিনত হয়েছে।অভিযোগ উঠেছে,একটি স্বার্থান্বেষী মহল থানাকে বা আদালতকে ব্যবহার করে এই বাণিজ্য চালাচ্ছে।মামলার প্রাথমিক এজাহারে নাম না থাকলেও পরে ‘তদন্তে প্রাপ্ত’ বা নাম যুক্ত করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শত্রুতা মেটাতে বা এলাকাছাড়া করতে বিত্তবান ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের টার্গেট করা হচ্ছে।
সাধারণ মানুষের ভোগান্তির সৃষ্টি হচ্ছে ব্যাক্তিগত আক্রোশ থেকে।একজন সাধারণ মানুষ যখন মিথ্যা মামলায় ফেঁসে যান, তখন তার শুধু আর্থিক ক্ষতিই হয় না,বরং সামাজিক মর্যাদা এবং পারিবারিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়।গ্রেফতারি পরোয়ানা এড়াতে অনেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন,ফলে তাদের কর্মসংস্থান ও আয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো আইনি লড়াই চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।
ফৌজদারি কার্যবিধির অপব্যবহার করে ঢালাওভাবে শত শত মানুষকে আসামি করা হচ্ছে। এর ফলে বিচার ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে এবং প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে পড়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও মাঠ পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রে নিরপরাধ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ কমছে না।
প্রাথমিক যাচাইয়ের মাধ্যমে মামলা নথিভুক্ত করার আগে পুলিশের উচিত অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই করা।
তদন্তে স্বচ্ছতার সাথে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত হয়ে বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।যারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা মামলা করছে বা মামলা নিয়ে বাণিজ্য করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। আদালতকে স্বপ্রণোদিত হয়ে দেখতে হবে কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন দীর্ঘ সময় বিনা বিচারে কারাভোগ না করেন।
মামলা বাণিজ্য বন্ধ না হলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা অসম্ভব।রাষ্ট্র ও প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে হবে যে, একজন অপরাধীও যেন ছাড় না পায়, কিন্তু একজন নিরপরাধ মানুষও যেন অহেতুক হয়রানির শিকার না হয়।জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
Viewed 2400 times