বগুড়া শহরে বৃক্ষনিধন ও সবুজ হারানোর ঝুঁকি
সম্পাদকীয়ঃ বগুড়া শহর একসময় ছিল সবুজের শহর। চারদিকে ছায়াঘেরা রাস্তা, স্কুলের পাশে বড় বড় বটগাছ, সরকারি অফিস চত্বরজুড়ে ফুলের বাগান—এসবই ছিল শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অংশ। কিন্তু আধুনিকায়নের প্রতিযোগিতায় সেই সবুজ এখন ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। নগরায়ণের চাপ, বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ, সড়ক প্রশস্তকরণ, ও অবৈধ দখলের ফলে বগুড়ার বৃক্ষরাজি আজ বিলুপ্তির পথে। এই অনিয়ন্ত্রিত বৃক্ষনিধন শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের জীবনকেও মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে।
শহরের বিভিন্ন এলাকায়—বিশেষ করে সাতমাথা, ফতেহ আলী, মালগ্রাম, নাটাইপাড়া, বনানী ও গোকুলমুখী এলাকায়—গত কয়েক বছরে শত শত পুরোনো গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। নতুন রাস্তা নির্মাণ ও বাণিজ্যিক প্রকল্পের জন্য গাছ কাটা যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অথচ এসব গাছই ছিল শহরের প্রাকৃতিক শ্বাসপ্রশ্বাসের উৎস। বগুড়া শহরে দিনে দিনে যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে, ধুলো ও ধোঁয়ায় বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। এই অবস্থায় যদি গাছ না থাকে, তাহলে বায়ুদূষণ ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার আরও আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ও বাতাস পরিশোধনে গাছের ভূমিকা অপরিসীম। বৃক্ষরাজি শুধু ছায়াই দেয় না, বরং বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে বাতাসকে শুদ্ধ রাখে। গাছ না থাকলে শহরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়, বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত হয় এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও দ্রুত নেমে যায়। ইতিমধ্যেই বগুড়া শহরে গরমের তীব্রতা আগের তুলনায় বেড়ে গেছে—গ্রীষ্মকালে শহরের তাপমাত্রা অনেক সময় ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে চলে যায়, যা অতীতের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
আরও একটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বৃক্ষনিধনের ফলে শহরের জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়ছে। আগে বগুড়ার পার্ক, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ কিংবা রাস্তার পাশে পাখির কিচিরমিচির শোনা যেত, এখন সেই সুর ম্লান হয়ে গেছে। প্রজাপতি, মৌমাছি, পাখি—প্রকৃতির এই প্রাণীগুলো হারিয়ে যাচ্ছে তাদের আশ্রয়স্থল হারানোর কারণে। শহর যত কংক্রিটে ভরছে, ততই প্রকৃতি সরে যাচ্ছে দূরে।
তবে এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার সম্ভব, যদি এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়। শহর পরিকল্পনায় বৃক্ষ সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা থাকা দরকার। রাস্তা প্রশস্ত করার সময় অন্তত একপাশে গাছ রেখে পরিকল্পনা করা উচিত। পাশাপাশি নতুন করে বৃক্ষরোপণ অভিযান চালাতে হবে—বিশেষ করে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, সরকারি অফিস ও আবাসিক এলাকার পাশে। স্থানীয় সরকার ও পৌরসভা কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদেরও এই দায়িত্ব নিতে হবে।
বগুড়ার নাগরিক সমাজকে বুঝতে হবে—গাছ মানে শুধু সৌন্দর্য নয়, গাছ মানে জীবন। একটি গাছ কেটে ফেলা মানে একটি ছায়া, একটি অক্সিজেনের উৎস, একটি জীবনের আশ্রয় ধ্বংস করা। তাই অকারণে বৃক্ষনিধন বন্ধ করতে আইনি কঠোরতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যে সব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি গাছ লাগাচ্ছে, তাদের উৎসাহিত করতে হবে সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে।
সবশেষে বলা যায়, উন্নয়ন অবশ্যই দরকার, কিন্তু সেই উন্নয়ন যেন ধ্বংস ডেকে না আনে। বগুড়া শহরকে যদি টেকসই ও বাসযোগ্য রাখতে চাই, তাহলে সবুজ ফিরিয়ে আনতেই হবে। বৃক্ষরোপণ শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, এটি আগামী প্রজন্মের জন্য জীবন বাঁচানোর অঙ্গীকার। এখনই সময়, শহরবাসী সবাই মিলে বলি—“সবুজ বাঁচাও, বগুড়া বাঁচাও।”
Viewed 5100 times