জ্ঞান ফেরেনি মানিক-রাহাতের, চোখ খুলে ডাকবে আশায় মা
ডেস্ক রিপোর্ট : চোর অপবাদে মারধরের শিকার মো. মানিক (১৪) ও ফারহান তানভীর রাহাতের (১৪) তিন দিনেও জ্ঞান ফেরেনি। মরার মতো পড়ে রয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শয্যায়। শরীরে দগদগে ক্ষত। প্রাণে বাঁচলেও পূর্ণ সুস্থ হবে কিনা, উৎকণ্ঠায় দিন পার করছেন স্বজনরা।
চিকিৎসকরা বলছেন, মানিকের ডান হাত ও রাহাতের বাঁ হাত ভেঙে গেছে। পুরো শরীরে অসংখ্য ক্ষত। অস্ত্রোপচার লাগতে পারে। সুস্থ হলেও দীর্ঘ সময় লাগবে। রোববার সরেজমিন চমেক হাসপাতালের নিচতলার ক্যাজুয়ালটি বিভাগের ১১ নম্বর শয্যায় দেখা যায়, মাদ্রাসার ছাত্র মানিক শুয়ে আছে, নড়াচড়া নেই। হাতে স্যালাইন চলছে। শরীরে জখমের স্থানগুলোতে ব্যান্ডেজ। শয্যাপাশে বিষণ্ন মা রোজিনা আক্তার। বড় বোন আঁখি আক্তারের চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
তারা জানালেন, মানিকের জ্ঞান পুরোপুরি ফেরেনি। হাত-পা নড়াতে পারছে না। ডাকাডাকির দীর্ঘক্ষণ পর চোখ খুললেও মুহূর্তে বন্ধ করে ফেলছে। কাঁদতে কাঁদতে রোজিনা আক্তার বললেন, ‘আমার ছেলেটার কী অপরাধ? ও তো কারও কোনো ক্ষতি করেনি? কেন এমন হাল করল তারা?’
মানিকের বড় বোন আঁখি আক্তার বলেন, ‘চিকিৎসক বেশ কিছু পরীক্ষা দিয়েছেন। বলেছেন, রক্ত দিতে হবে; অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে। ঘটনার তিন দিন পরও দোষীরা গ্রেপ্তার হয়নি। আমরা কার কাছে বিচার চাইব?’
ক্যাজুয়ালটি বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. মাইমুনা বলেন, ‘মানিকের বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। রক্ত দেওয়া হচ্ছে। সুস্থ করতে যা প্রয়োজন, করা হচ্ছে। তবে এখনও মানিককে শঙ্কামুক্ত বলা যাচ্ছে না।’
একই অবস্থা সপ্তম শ্রেণির ছাত্র রাহাতের। নির্যাতনে তার ডান হাত ভেঙেছে। পিঠজুড়ে ছোপ ছোপ জমাট রক্ত। জ্ঞান ফেরেনি। দীর্ঘক্ষণ পর একটু-আধটু নড়াচড়া করছে। চমেক হাসপাতালের ২৬ নম্বর অর্থোপেডিক ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রাহাত। ছেলের এ অবস্থায় ঘোর অন্ধকার নেমে এসেছে পরিবারে।
সীমাহীন দুশ্চিন্তা ও শঙ্কায় ছেলের শয্যাপাশে সময় কাটছে মা রোজী আক্তারের। কান্নারত অবস্থায় তিনি বলেন, ‘ছেলেটা ভালো নেই। ওর মুখে মা ডাক শুনছি না চার দিন। জ্ঞান ফেরেনি। সামান্য তরল খাবার চেষ্টা করেও হয়নি। শুধু স্যালাইনে টিকে আছে। হয়তো চোখ খুলবে, মা বলে ডাকবে, সে আশায় সারাক্ষণ জেগে থাকছি।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে রোজী আক্তার বলেন, ‘এখনও হামলাকারীরা গ্রেপ্তার হয়নি। পুলিশ কি ম্যানেজ হয়ে গেছে? জড়িতরা গ্রেপ্তার না হলে কী হবে– নানা ভয়-শঙ্কায় দিন কাটছে।’
অর্থোপেডিক ওয়ার্ডের কর্তব্যরত চিকিৎসক মিজানুর রহমান বলেন, ‘রাহাতের এক হাতে প্লাস্টার করা। দুই পাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ মারাত্মক জখম। হয়তো অস্ত্রোপচার লাগতে পারে।’
শুক্রবার ভোরে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নের চেইঙ্গার ব্রিজের রেলিংয়ে বেঁধে তিন কিশোরকে মারধর করা হয়। চোর অপবাদ দিয়ে দফায় দফায় তাদের পেটানোর এক পর্যায়ে ঝুলিয়ে পুরো শরীরে নির্যাতন করা হয়। ঘটনাস্থলেই রিহান উদ্দিন মাহিন (১৫) মারা যায়। এর পরও মানিক এবং রাহাতকে ছাড়েনি তারা। পরে মুমূর্ষু অবস্থায় চমেক হাসপাতালে দু’জনকে ভর্তি করা হয়।
মাহিন হত্যা মামলায় ফারাজ উদ্দিন নামে আরেকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল সন্ধ্যায় উপজেলার পাইন্দং ইউনিয়নের বেড়াজালী এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানান ওসি নূর আহমেদ। তিনি বলেন, গ্রেপ্তার দুই আসামি– নোমান ও আজাদের জবানবন্দিতে ফারাজের সম্পৃক্ততা উঠে এসেছে। তদন্তেও কিছু তথ্য পাওয়া গেছে।
Viewed 4650 times




