ইউক্রেনে ‘নিরাপত্তা নিশ্চয়তা’ আসলে কী
ডেস্ক রিপোর্ট : হোয়াইট হাউসে সোমবার ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে একাধিকবার ডোনাল্ড ট্রাম্প উল্লেখ করেন, ইউক্রেনকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্র কিয়েভকে খুব ভালো সুরক্ষা দেবে। নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সমন্বয় করবে। ভলোদিমির জেলেনস্কি নিজেও যুদ্ধ বন্ধের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চেয়েছেন।
তবে বৈঠকে একাধিকবার নিরাপত্তা নিশ্চয়তার প্রসঙ্গে ট্রাম্প ও জেলেনস্কি কথা বললেও সেখানে এ বিষয়টি নিয়ে তারা বিস্তারিত কিছু বলেননি। এই নিরাপত্তা নিশ্চয়তা আসলে কী এবং কীভাবে কাজ করবে সেটিও এখনো কোনো পক্ষ স্পষ্ট করেনি। তবে এ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাক্ষাৎকার থেকে।
মঙ্গলবার ফরাসি সম্প্রচার মাধ্যম টিএফওয়ান-এ মাখোঁর একটি সাক্ষাৎকার প্রচার করা হয়। সেখানে তিনি নিরাপত্তা নিশ্চয়তা সম্পর্কে ধারণা দেন। অপরদিকে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ প্রসঙ্গে কথা বলেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
ট্রাম্প ঠিক কী বলেছিলেন
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সোমবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ শেষ হলে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সাহায্য করতে পারে। তখন সাংবাদিকরা আরেকটি প্রশ্ন করেন এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র কি ইউক্রেনে সেনা পাঠাবে? জবাবে ট্রাম্প বলেন, এ বিষয়ে এখন কিছু বলবেন না। পরে জানাবেন। ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের বরাত দিয়ে বিবিসি তাদের লাইভ ব্লগে লিখে, ট্রাম্প আসলে ইউক্রেনে সেনা পাঠানোর প্রসঙ্গটি পুরোপুরি নাকচও করেননি।
বক্তব্যের আরেক পর্যায়ে ট্রাম্প উল্লেখ করেন, এই নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে ইউক্রেনে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে।
এর আগে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ সিএনএনকে বলেছিলেন, রাশিয়া ন্যাটোর আর্টিকেল-৫ এর সমমানের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিতে রাজি হয়েছে। আর্টিকেল-৫ এর অর্থ হলো ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশের ওপর আক্রমণ মানে সব দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে। তখন সব সদস্য মিলে আক্রমণ প্রতিহতে কাজ করবে।
সোমবার হোয়াইট হাউসে ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেনের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা আগামী ১০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করা হবে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৯০ বিলিয়ন ডলারের (৬৬ বিলিয়ন পাউন্ড) অস্ত্র কেনার পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত আছে।
নিরাপত্তা নিশ্চয়তা কী
এমানুয়েল মাখোঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিষয়টি হলো- ইউরোপ এবং শান্তি চুক্তি তদারকি করতে আগ্রহী দেশগুলোর জোট কিছু প্রতিশ্রুতি পূরণে বাধ্য থাকবে।
মাখোঁ বলেছেন, নিরাপত্তা নিশ্চয়তার আওতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে সেটি হলো একটি শক্তিশালী ইউক্রেনিয়ান সেনাবাহিনী গঠন। যেটির সদস্য হবে কয়েক লাখ। এই বাহিনীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও উচ্চ মানের প্রশিক্ষণ থাকবে।
মাখোঁ আরও বলেন, দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- আকাশ, সমুদ্র ও স্থলভাগে নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, তুর্কিয়ে (তুরস্ক) এবং অন্যান্য দেশগুলো সহযোগিতা করবে। এই সহযোগিতার মধ্যে আছে কৌশলগত সংকেত পাঠানো।
নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ধরন
বিবিসির নিরাপত্তা বিষয়ক প্রতিবেদক ফ্র্যাঙ্ক গার্ডনার বলছেন, ভবিষ্যতে ইউক্রেন-রাশিয়ার মধ্যে স্থায়ী শান্তি চুক্তি হলে সেটির মূলে থাকবে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা। যেটির আওতায় রাশিয়া প্রতিশ্রুতি দেবে যে তারা আর ইউক্রেনে হামলা চালাবে না। কিন্তু এই নিরাপত্তা নিশ্চয়তা বাস্তবায়ন হবে কীভাবে? গার্ডনার বলছেন, এটির সম্ভাব্য চারটি ধরন হতে পারে। প্রথমত, মাঠে শান্তিরক্ষী নামানো। দ্বিতীয়ত আকাশ ও সমুদ্রপথে নজরদারি রাখা, তৃতীয়ত স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিরীক্ষণ এবং সবশেষে ইউক্রেনকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া।
রুবিও যা বলছেন
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও বলেছেন, বিশ্বের যেকোনো সার্বভৌম দেশের নিরাপত্তা জোটে যোগ দেওয়ার অধিকার আছে। এটা শুধু ন্যাটোই হতে হবে বিষয়টা এমন নয়। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি আছে। জাপানের সঙ্গেও আছে। বিশ্বের অন্য দেশগুলোরও নিজেদের মধ্যে এ ধরনের চুক্তি আছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চাপ বা প্রস্তাবের কারণে এবার প্রথমবারের মতো রাশিয়াও স্বীকার করেছে, যুদ্ধ পরবর্তী ইউক্রেনের অন্য দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি করার অধিকার আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কেমন হবে? রুবিও বলেন, ইউক্রেনীয়রা প্রকাশ্যেই বলেছে যে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা হলো একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলা। এখানে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে অস্ত্র দিচ্ছে না, অর্থও দিচ্ছি না। যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছে অস্ত্র বিক্রি করছে, ইউরোপীয়রা এর দাম দিচ্ছে ন্যাটোর মাধ্যমে। মূলত, ইউরোপীয়রা ন্যাটো ব্যবহার করছে অস্ত্র কিনে ইউক্রেনের কাছে হস্তান্তর করার জন্য।
রুবিও আরও বলেন, যেকোনো যুদ্ধ বা সংঘাত শেষ করার আলোচনায় উভয় পক্ষকে দিতে এবং পাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
অস্ত্র কেনার ‘চুক্তি’
প্রেসিডেন্ট জেলনস্কি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে লিখেছেন, ওয়াশিংটনের বৈঠকটিকে যুদ্ধ শেষ করার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে ধরা যেতে পারে। একইভাবে ইউক্রেনে নিরাপত্তা নিশ্চিতের ব্যাপারেও ভালো পদক্ষেপ। আমরা ইতোমধ্যেই নিরাপত্তা নিশ্চয়তার কংক্রিট বিষয়বস্তু নিয়ে কাজ করছি।
মঙ্গলবার ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের ইউরোপীয় সমর্থকরা ১০০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থেকে অস্ত্র কিনবে। এই অস্ত্র ইউক্রেনকে সরবরাহ করা হবে। চারজন সূত্র ও কিয়েভের একটি নথির বরাত দিয়ে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস আরও জানিয়েছে, অস্ত্র সংগ্রহ প্রস্তাবের পাশাপাশি, ইউক্রেন নিজ দেশের ভেতরে ড্রোন উৎপাদনের জন্য ৫০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ সংক্রান্ত নথি কিয়েভ মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিনিময় করেছে। নিরাপত্তার জন্য ইউক্রেন অন্তত ১০টি প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স মিসাইল সিস্টেমও কিনতে চায়।
Viewed 4950 times