আলুর উৎপাদন খরচ কেজিতে ২৩ টাকা, পাইকারি বিক্রি ১৪
ডেস্ক রিপোর্ট : জলিল সরদারের কাছে ইলিশ খাওয়ার বায়না করেছিল ছোট্ট মেয়েটি। হাটে আলু বিক্রি করে তার জন্য ইলিশ কিনে নিয়ে যাবেন–এমনই কথা দিয়েছিলেন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার উদপাড়ার চাষি জলিল। শুক্রবার উপজেলার বৃহত্তম তাহেরপুর হাটে বিক্রির জন্য পাঁচ মণ আলু নিয়ে যান তিনি। সেই আলু বিক্রি করেন ২৭৫০ টাকায়। সংসারের অন্যান্য জিনিসপত্র কিনতে গিয়ে দেখেন, যে টাকা বাড়তি আছে তা দিয়ে ইলিশ কেনা যাবে না। বাধ্য হয়ে সিলভার কার্প নিয়ে ফেরেন জলিল।
বাগমারার হামিরকুৎসা ইউনিয়নের চাষি জলিল সরদার বললেন, ‘তেল, সাবান, নুনসহ আরও দুয়েকটা দরকারি জিনিস কেনার পর ইলিশের কাছে দাঁড়াইতে পারিনি। এক পিস ইলিশের দাম উঠছে ২১০০ টাকা। তখন আমার কাছে ১৭০০ টাকা আছিল।’ অভিমানে জলিল বললেন, ‘সামনের বছর আর আলু চাষ করমু না। এর চেয়ে মানুষের বাড়িতে কামলা দেওয়া ভালা।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, বাগমারায় চলতি মৌসুমে ৯৫০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। চাষ হয়েছে ৯৮৫০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ১০ টন, অথচ মোট উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৯৫ হাজার ৫০০ টন আলু। প্রতি হেক্টর জমিতে আলু উৎপাদনে জমির ইজারা খরচ ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা, চাষ বাবদ ১৪ হাজার ৯৫০, বীজ বাবদ ১ লাখ ১২ হাজার, সারের জন্য ৬৫ হাজার, কীটনাশকে ৪২ হাজার, সেচে ২২ হাজার, শ্রমিক খরচ ৪৭ হাজার, পরিবহন ৫৮ হাজার, কোল্ডস্টোরেজ ভাড়া বাবদ প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার ২৫০ টাকা খরচ হয়েছে এবার। সব মিলিয়ে উপজেলায় উৎপাদিত ২ লাখ ৯৫ হাজার ৫০০ টন আলুর পেছনে খরচ হয়েছে ৭৫৬ কোটি ৬৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা। অথচ বর্তমান বাজার মূল্যে এই আলুর দাম ৪৪৫ কোটি ৪১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। অর্থাৎ বাগমারায় এবার আলু উৎপাদনে কৃষকের লোকসান হয়েছে ৩৩১ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাগমারার কৃষকদের প্রতি কেজি আলুতে উৎপাদন খরচ হয়েছে ২৩ টাকা। তারা পাইকারি বিক্রি করতে দিয়ে দর পাচ্ছেন ১৩-১৪ টাকার মধ্যে। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে কৃষকের লোকসান হয়েছে প্রায় ১০ টাকা। এ অবস্থায় আলু নিয়ে হতাশায় রয়েছেন কৃষকেরা।
যোগীপাড়া ইউনিয়নের ভাগনদী গ্রামের চাষি সামছুর রহমান তিন মণ আলু বিক্রি করতে শনিবার গিয়েছিলেন একই ইউনিয়নের সিকদারী বাজারে। দাম কম হওয়ায় শুরুতে এসব ফেরত নিয়ে বাড়ি যাওয়ার চিন্তা করছিলেন। পরে যদি দাম আরও কমে যায়, সে কারণে বাধ্য হয়ে ছোট আকারের আলু ৪৭০ টাকা মণ দরে বিক্রি করেন। সামছুর রহমান বলেন, ‘শুনতেছি খুচরা বাজারে আলুর দাম কিছুটা বেশি। পাইকারিতে এত কম কেন?’ পাইকারি ও খুচরা বাজারে দরের এই ব্যবধানের জন্য তিনি কৃষি বিপণন ব্যবস্থাকে দায়ী করেন।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের রাজশাহী অঞ্চলের কর্মকর্তা সুমন হালদার জানান, পাইকারি বাজারে আলু ১৩-১৪ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে তা ২০-২১ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আলুর দাম বাড়ার সম্ভাবনা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের অধিদপ্তর একটি আবেদন মন্ত্রণালয়ে দিয়েছে। শিগগির ফলাফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে দাম কিছুটা বাড়তে পারে।’
রোববার কথা হয় হামিরকুৎসা ইউনিয়নের কোনাবাড়িয়া গ্রামের জহুরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি এবার ৬ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। এতে সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা। বিঘাপ্রতি তাঁর ফলন হয়েছে ১১০ মণ। মোট ফলনের পরিমাণ ৬৬০ মণ। ৫৫০ টাকা মণ দরে তিনি বিক্রি করেছেন তিন লাখ ৬৩ হাজার টাকা। তাঁর লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৫৭ হাজার টাকায়। জহুরুল ইসলামের ভাষ্য, ‘এখনও এনজিও থেকে নেওয়া ২ লাখ টাকা ঋণ ও সার-ওষুধের দোকানে বাকি আছে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা। কোল্ডস্টোরেজের (হিমাগার) ভাড়া কীভাবে পরিশোধ করব, তা ভেবে পাচ্ছি না।’
বীরকুৎসা গ্রামের কৃষক সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, দাম না পেয়ে এবার কৃষকেরা রাস্তায় আলু ফেলে কয়েকবার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তবুও দাম বাড়ার কোনো লক্ষণ তারা দেখছেন না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, খাদ্যে উদ্বৃত্ত বাগমারায় এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আলু উৎপাদিত হয়েছে। কৃষকরা দাম না পেয়ে হতাশ। আলুর দাম না বাড়লে আগামী বছর তারা আলু চাষে নিরুৎসাহিত হবেন।
রাজশাহী কৃষি তথ্য সার্ভিস সূত্রে গতকাল সোমবার জানা গেছে, চলতি বছর রাজশাহী জেলায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৫ হাজার হেক্টর জমি। চাষ হয়েছে ৩৮ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ লাখ ৪৫ হাজার টন। উৎপাদন হয়েছে ১০ লাখ ৩০ হাজার ৫১৭ টন। এর মধ্যে বাগমারায় উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৯৫ হাজার ৫০০ টন, মোহনপুরে ১ লাখ ১ হাজার ৬৮৬ টন, পবায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৩৫ টন, দুর্গাপুরে ৫ হাজার ৩৭০ টন, চারঘাটে ৭ হাজার ৭৮১ টন।
আঞ্চলিক কৃষি তথ্য কর্মকর্তা মোছা. ফরিদা ইয়াসমিন এসব তথ্য নিশ্চিত করে সমকালকে বলেন, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এবার আলু উৎপাদন বেশি হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে দাম বাড়তে পারে।
Viewed 5900 times