May 12, 2026

Daily Amar Vasha

উত্তর জনপদে সত্য প্রকাশে দৃঢ়

প্রাত্যহিক শাসনে সক্ষমতার ঘাটতি

ডেস্ক রিপোর্ট : অন্তর্বর্তী সরকার এক বছর পূর্ণ করেছে। শুরুতেই আমি এক বছর আগের অর্জন স্মরণ করতে চাই। সাধারণ মানুষ বুকের রক্ত দিয়ে যেভাবে গেড়ে বসা এক কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থাকে ফেলে দিতে পেরেছে, তার গুরুত্ব অনুধাবন করা এবং এই শক্তিবোধ চাঙ্গা করা দরকার। এর দার্শনিক, মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগিক শক্তি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

দ্বিতীয়ত, এক বছরে এসে বর্তমান সরকারের একটা নির্মোহ খতিয়ান দরকার। প্রত্যাশার দিক থেকে যদি চিন্তা করি, তবে দেখতে হবে, সাধারণ মানুষের কী প্রত্যাশা ছিল। যারা দায়িত্ব নিয়েছেন তাদের এবং রাজনীতিকদেরইবা প্রত্যাশা কী ছিল?

তৃতীয় বিষয়টি হলো, কেবল পেছনে না তাকিয়ে সামনে তাকানো দরকার। অর্থাৎ, পরবর্তী অধ্যায়টা কীভাবে সাজানো উচিত।
জুলাই অভ্যুত্থানে আমাদের যে ঐক্য ছিল, তার অনেকখানিই দুর্বল হয়ে গেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এখনও অটুট আছে। ন্যায়ভিত্তিক ও সবার অংশগ্রহণে উন্নত-সক্ষম রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা এখনও পুরোপুরি আছে। পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ছিল বিশাল। সেখানে সরকারের এক বছরের পারফরম্যান্স দেখতে গেলে নির্দিষ্ট কিছু সূচক আলোচনার দাবি রাখে। যেমন– ভেঙে পড়া সামষ্টিক অর্থনীতিকে জোড়া লাগানোর একটা জরুরি কাজ ছিল। এটি অন্তর্বর্তী সরকার সফলভাবেই করতে পেরেছে।

তবে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা একটা বিষয় আর সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের স্বস্তি আরেকটা বিষয়। সেখানে প্রশ্ন আছে।
আরেকটা বড় সূচক বলা যেতে পারে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি। সেটি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারত। সেখানে কোনো বিপর্যয় ঘটেনি। তা সরকার কাটাতে পেরেছে।

তবে রাষ্ট্রের‌ প্রাত্যহিক শাসনের সূচক যদি আমরা দেখি, সেখানে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিচার ব্যবস্থা, দুর্নীতি ইত্যাদি আমরা দেখছি। অর্থাৎ, এখানে সরকারের সক্ষমতার ব্যাপক ঘাটতি স্পষ্ট। ঘোষণা অনেক কিছু হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি।
ঘোষণা ও বাস্তবায়নের ফারাক বিস্তর।

আরেকটা হলো কাঠামোগত সংস্কার। সংস্কারের জন্য কিছু কমিশন গঠন করেছে সরকার। কিন্তু স্বৈরাচার বিলোপের গুরুত্বপূর্ণ সব অনুষঙ্গ নজরে আনা হয়নি। অতি ক্ষমতায়িত প্রধান নির্বাহী ক্ষমতা নিয়েই কেবল আলোচনা হয়েছে। যেমন– প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ কতদিন হবে ইত্যাদি। স্বৈরাচারের এটিই একমাত্র স্তম্ভ নয়। আরও চার-পাঁচটি বিষয় এর সঙ্গে যুক্ত।

অতি ক্ষমতায়িত প্রধান নির্বাহীর মতো ৩০০ আসনে ৩০০ ছোট ছোট স্বৈরাচার ছিল। তাদের আমি বলছি, এমপিরাজ। তাদের ক্ষমতার বিষয় আলোচনার বাইরে থেকে গেছে। প্রধান নির্বাহীর পাশাপাশি এদের বিষয়ে দৃষ্টি না দিলে দুদিন পর এই বাস্তবতা আবার পূর্বের মতো ফিরে আসতে পারে।

প্রশাসন ও পুলিশ আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেখানে চেইন অব কমান্ড যে ভেঙে পড়েছে, তার মেরামত এই সরকার করতে পারেনি। বস্তুত কর্তৃত্ববাদী শাসন এভাবেই চলে, অর্থাৎ চেইন অব কমান্ডের বাইরে গিয়ে ‘পারসোনালাইজড’ করে ফেলা। এই সূচকেও উন্নতি নেই।

বলা চলে, এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার একটা কৌশলগত সমস্যা সৃষ্টি করেছে। তারা পরিবর্তনের অনেক কিছু চিন্তা করেছেন। কিন্তু তা বাস্তবায়নে বেছে নিয়েছেন গতানুগতিক আমলাতন্ত্রকে। এক বছরে তারা আমলা শাসনকে যেভাবে ক্ষমতায়িত করেছেন, তা কিন্তু স্ববিরোধী।

আরেকটা বিষয় হলো, স্থানীয় সরকার। যার সঙ্গে জনগণের সম্পৃক্ততা অনেক বেশি, তাকে সার্বিকভাবে আরও দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। সরকার একটা কমিশন করেছে। কমিশন প্রতিবেদন দিলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। বরং স্থানীয় সরকারেও আমলাদের বসানোর প্রবণতা দেখা গেছে।
এখানে দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপক ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। একজন উপদেষ্টা বললেন, মসজিদ কমিটির সভাপতি পদেও নাকি প্রশাসক তথা আমলাকে বসানো হবে। এটি প্রকারান্তরে সমাজের ডায়নামিকস এবং কমিউনিটির শক্তি অস্বীকারের শামিল।

এ সরকারের রাজনৈতিক দর্শনে জনগণের সঙ্গে কৌশলগত যোগাযোগকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে নেওয়া হয়নি। মানুষের সঙ্গে কথা বলাও রাষ্ট্র পরিচালনার মতো সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বলে যাওয়া নয় বরং ‘টু ওয়ে কমিউনিকেশন’ দরকার ছিল।

যে তরুণরা জুলাই অভ্যুত্থান এনেছে, তাদের ব্যাপারেও দৃষ্টিভঙ্গির সংকট স্পষ্ট। আমাদের তরুণরা সংখ্যায় আছে, মানবসম্পদ হিসেবে নেই। অনুরূপভাবে শিক্ষা আছে, মানবসম্পদ নেই। কোচিং, সার্টিফিকেটসর্বস্ব শিক্ষা মানবসম্পদ তৈরি করছে না। এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গুরুত্ব দিতে পারত। কিন্তু তারা এটি নজরের মধ্যেই আনেনি।
এবার ভবিষ্যতের কথা বলি। প্রধান উপদেষ্টার ভাষণের মাধ্যমে নির্বাচনী রোডম্যাপের একটা ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। নির্বাচনী রোডম্যাপ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সমান্তরালভাবে মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা এবং কাঠামোগত সংস্কারও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের ঘোষণার মাধ্যমে নির্বাচনী মাঠ কিছুটা উন্মুক্ত হলো, কিন্তু খেলোয়াড়রা কী উদ্দেশ্যে এবং কীভাবে নিজেদের উপস্থাপন করবেন, তা দেখতে হবে। সেখানে জনসমর্থন পাওয়ার জন্য আগের মতো অসুস্থ প্রতিযোগিতা কিংবা মনোনয়ন বাণিজ্য চলবে কিনা, তাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

পাশাপাশি সাধারণ মানুষের শক্তিকে কাজে লাগানোর বিষয়ও ভাবতে হবে। মব ইত্যাদি কারণে সাধারণ মানুষ যেভাবে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে, সেখানে তাদের আবারও সাহস দিতে হবে। সরকার না দিলেও সাধারণ মানুষকে নিজেদের মধ্যেই সেই সাহসটা খুঁজতে হবে। আশা করা যায়, মানুষ আবারও নিজেদের বের করে আনবে এবং তারাই তাদের চাহিদার কথা বলবে এবং সেজন্য চাপ প্রয়োগ করবে।

রাজনীতিকদের যেমন মাঠে থাকা জরুরি, নাগরিক সমাজেরও মাঠে থাকা সমানভাবে জরুরি। রাজনীতিকদের অন্যতম কাজ হওয়া উচিত দলীয় কর্মী নয়, সাধারণ নাগরিকদের কীভাবে সুযোগ করে দিতে পারে, সে ব্যবস্থা করা।

Viewed 6700 times

Spread the news
Copyright © All rights reserved. | Newsphere by AF themes.
error: Content is protected !!