“মাদকের ছোবলে যুব সমাজ:সহজলভ্যতাই কি সর্বনাশ ডেকে আনছে?”
‘মাদকের সহজলভ্যতা:ধ্বংসের পথে যুব সমাজ’
সম্পাদকীয়ঃ
আজকের প্রজন্মই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। কিন্তু উদ্বেগজনক সত্য হলো—আমাদের সমাজের এই তরুণ প্রজন্ম ক্রমশ মাদকের জালে আটকে যাচ্ছে। সহজলভ্যতার কারণে মাদকদ্রব্য এখন হাতের নাগালে চলে এসেছে। অল্প বয়সী কিশোর থেকে শুরু করে তরুণ-তরুণী, এমনকি শিক্ষার্থীরাও এ মরণব্যাধির শিকার হচ্ছে প্রতিদিন। ফলে একটি সম্ভাবনাময় প্রজন্ম ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে গেছে।
মাদক এমন এক ভয়ংকর অভ্যাস, যা একবার গ্রাস করলে মুক্তি পাওয়া দুঃসাধ্য। এটি শুধু শরীরকে ধ্বংস করে না, বরং মানুষের চিন্তাভাবনা, নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধকেও ভেঙে দেয়। আজকের তরুণরা হতাশা, কৌতূহল, বন্ধুদের প্ররোচনা বা আধুনিকতার নামে ভুল প্রবণতায় পড়ে মাদক গ্রহণ শুরু করে। একবার অভ্যস্ত হলে তারা পরিবার, পড়াশোনা, সমাজ—সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অথচ এ প্রজন্মই তো দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির চালিকাশক্তি।
মাদকের সহজলভ্যতাই মূল সমস্যার জায়গা। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে গ্রামের বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশেপাশে—সব জায়গাতেই বিভিন্ন ধরনের মাদকের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ নানা মাদকদ্রব্য পাচারের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। সীমান্ত দিয়ে প্রতিনিয়ত দেশে প্রবেশ করছে এসব মাদক। আবার দেশের ভেতরেও গড়ে উঠেছে অসংখ্য চক্র, যারা যুব সমাজকে ধ্বংস করার ব্যবসা করছে। উদ্বেগজনক হলো, এই চক্রের সাথে অনেক প্রভাবশালী ও অসাধু ব্যক্তির যোগসাজশ রয়েছে। ফলে সহজে বন্ধ করা যাচ্ছে না এই ভয়াবহ প্রবণতা।
মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে ধ্বংস করে না, বরং গোটা সমাজকেই বিপর্যস্ত করে। মাদকের কারণে চুরি, ছিনতাই, হত্যা, ধর্ষণসহ নানা অপরাধ বাড়ছে প্রতিনিয়ত। একসময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেখানে আলোচনার বিষয় ছিল শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, সেখানে এখন অনেক জায়গায় গোপনে ছড়িয়ে পড়ছে মাদক। পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছে, অভিভাবকরা অসহায় হয়ে পড়ছে। মাদকের টাকার যোগান দিতে গিয়ে তরুণরা জড়িয়ে পড়ছে অপরাধ জগতে। এর ফলে সমাজে অস্থিরতা ও অশান্তি দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্র ও সমাজকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। প্রথমত, সীমান্ত ও ভেতরের মাদকপাচার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কার্যকর হতে হবে। মাদক ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব যাই থাকুক না কেন, কঠোর হাতে দমন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। সন্তানদের চলাফেরা, বন্ধু নির্বাচন ও মানসিক অবস্থা সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন থাকা প্রয়োজন। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের শুধু বই পড়ানোতেই সীমাবদ্ধ থাকবেন না, বরং তাদের জীবনবোধ, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করবেন।
তৃতীয়ত, তরুণদের মধ্যে ইতিবাচক বিনোদন, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে হলে তরুণদের অবসর সময় সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, মাদকের সহজলভ্যতা শুধু যুব সমাজ নয়, গোটা জাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি। যদি আমরা এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নেই, তবে একদিন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি—মাদকের বিরুদ্ধে শপথ নিয়ে যুব সমাজকে সুস্থ, সুন্দর ও আলোকিত জীবনের পথে ফিরিয়ে আনব।
Viewed 9800 times