May 13, 2026

Daily Amar Vasha

উত্তর জনপদে সত্য প্রকাশে দৃঢ়

মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেও আফগানিস্তানে এত প্রাণহানি কেন

ডেস্ক রিপোর্ট : আফগানিস্তানের যে এলাকায় ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে সেটি হিন্দুকশ পর্বতমালা অঞ্চলে। হিন্দুকুশ হিমালয়ের একটি উপ-পর্বতমালা। এর পাদদেশেই অবস্থিত প্রতিবেশী দুই দেশ আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের কিছু এলাকা।

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের গ্রামীণ জনপদ থেকে দূরের এই পর্বতমালা দেখায় অনিন্দ্য সুন্দর। চূড়ায় জমে থাকা বরফ, নেমে আসা নদী ও সবুজ দিগন্ত আকৃষ্ট করার মতো। ভূ-উপরিভাগে এমন মনোরম দৃশ্য হলেও ভূ-অভ্যন্তরের কাঠামো বেশ জটিল। টেকটনিক প্লেটের সংঘর্ষে তৈরি হয়েছে একাধিক ফাটল বা ফল্ট লাইন। আফগানিস্তান এই ফল্ট লাইনের ওপরেই অবস্থিত।

হিন্দুকুশ পর্বতমালার একাংশ। ছবি: সংগৃহীত

হিন্দুকুশ পর্বতমালার একাংশ। ছবি: সংগৃহীত

রোববার মধ্যরাতে আফগানিস্তানে অনুভূত হওয়া ভূকম্পের মাত্রা ছিল ৬। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য অনুযায়ী, ৫ দশমিক ৩ থেকে ৬ দশমিক ২ পর্যন্ত মাত্রাকে মাঝারি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রিখটার স্কেলে মাত্রা ৬ দশমিক ৩ এ পৌঁছালে সেটিকে শক্তিশালী ভূমিকম্প বলা হয়। তাই প্রশ্ন উঠছে আফগানিস্তানে আঘাত হানা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেও ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি এত বেশি কেন।

দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছেন আড়াই হাজারের বেশি। ধসে গেছে অনেক বসতবাড়ি ও স্থাপনা। এগুলোর নিচে চাপা পড়েছেন অনেকে। ধারণা করা হচ্ছে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে।

উৎপত্তি যেখানে
ইউএসজিএস এর বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ভূকম্পনের উৎপত্তিস্থল আফগানিস্তানের জালালাবাদ শহরের পূর্ব-উত্তরপূর্বের ৪২ কিলোমিটার দূরে। কেন্দ্রস্থলের গভীরতা তুলনামূলকভাবে কম, মাটির মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে। একাধিক গণমাধ্যম এই গভীরতা ৮ কিলোমিটার বলে জানিয়েছে।

জালালাবাদ দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় নানগারহার প্রদেশের পঞ্চম বৃহত্তম শহর। ভূমিকম্পে নানগারহার ছাড়াও কুনার ও লগমান প্রদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজধানী কাবুলেও কম্পন অনুভূত হয়।

কুনার ও নানগারহার প্রদেশের বেশ কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, রোববার রাতেই তারা একাধিক পরাঘাত (আফটারশক) অনুভব করেছেন। নানগারহারের ২৮ বছর বয়সী পোলাদ নুরি বলেন, তিনি অন্তত ১৩ বার পরাঘাত অনুভব করেছেন। তাঁর এলাকার শত শত বাসিন্দা ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় বের হন। তিনি তাঁর জীবনে আগে কখনো এত শক্তিশালী ভূমিকম্প দেখেননি।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত এক শিশু। পাশে স্বজনরা। সোমবার আফগানিস্তানে। ছবি: এএফপি

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত এক শিশু। পাশে স্বজনরা। সোমবার আফগানিস্তানে। ছবি: এএফপি

আগে বন্যা পরে ভূমিকম্প
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলটিতে কয়েকদিন আগেও আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে জনপদ। স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার থেকে শনিবারের মধ্যে নানগারহার ও কুনার প্রদেশে বন্যা দেখা দেয়। এতে প্রাণ হারান অন্তত পাঁচজন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) গতকাল রোববার জানায়, বন্যায় অন্তত ৪০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় ভূমিধসের পাশাপাশি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তপথে যোগাযোগ সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়।

পাহাড়ি ভূ-প্রকৃতি ও ঘনবসতি
হিন্দুকুশ পর্বতমালার পাদদেশে হওয়ায় আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলটি বেশ দুর্গম। তবে এখানে জনবসতি অনেক বেশি। নিউ ইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, শুধু জালালাবাদ শহরেই বসবাস ২ লাখ মানুষের। এমন পরিবেশই অঞ্চলটিকে ভূমিকম্প কিংবা প্রাকৃতিক দুরযোগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ক্রিস এল্ডার্স বলেন, ভূমিকম্পে এ এলাকার শুধু ভবন ও স্থাপনা কাঁপবে বিষয়টা এমন নয়। পাহাড়ের ঢালগুলোও ধসে পড়বে। ঠিক এ দিকটিই বড় আশঙ্কা তৈরি করে। কারণ, ভূমিধস হলে ঘরবাড়ি চাপা পড়বে, সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হবে। ফলে উদ্ধার কাজও বিলম্বিত হবে।

ত্রিস এল্ডার্স বলছেন, এ মাত্রার ভূমিকম্প এ অঞ্চলে যেকোনো সময় দেখা দিতে পারে। আগে থেকে পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন। আবার আঘাত হানলে পরাঘাতও (আফটারশক) দেখা দেবে। সাধারণত একবার ভূমিকম্পনেই মানুষের মাঝে আতঙ্ক তৈরি হয়। পরাঘাতের বিষয়টি মাথায় থাকলে এই আতঙ্কের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।
এ অঞ্চলের বসতি স্থাপনাগুলোর বেশিরভাগই কাঠ, কাদা ইট বা দুর্বল কংক্রিট দিয়ে তৈরি। যেগুলো ভূমিকম্প প্রতিরোধী নয়।

কেন এত ভূমিকম্প ও ক্ষতি
ভূতাত্ত্বিক মতবাদ অনুসারে, পৃথিবীর ভূত্বক প্রধানত সাতটি বড় ও কয়েকটি ক্ষুদ্র গতিশীল কঠিন প্লেট দ্বারা গঠিত। যেগুলো ভ্রাম্যমাণ উষ্ণ গুরুমন্ডলীয় পদার্থের ওপর ভাসছে। প্লেটগুলোর নড়াচড়ায় ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত, পর্বত সৃষ্টির মতো ঘটনা ঘটে। যেমন, ভারতীয় প্লেট ও এশীয় প্লেটের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে বঙ্গীয় অববাহিকার উৎপত্তি।

এই প্লেটগুলোর সংযোগস্থলে বা মাঝখানে চাপ তৈরি হলে কঠিন শিলা ফেটে যায়। যেটিকে বলা হয় ‘ফল্ট লাইন’। আফগানিস্তানে ভারতীয় ও ইউরেশিয়ান টেকটনিক প্লেটগুলো মিলিত হয়েছে। আর সংঘর্ষে তৈরি হয়েছে হিন্দুকুশ পর্বতমালা ও ভূঅভ্যন্তরের একাধিক ফল্ট লাইন। আফগানিস্তানের কিছু এলাকা এই ফল্ট লাইনের ওপর অবস্থিত। ফলে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়।

ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় দেশটিতে গত দুই দশকের মধ্যে অন্যতম বড় ভূমিকম্প আঘাত হানে ২০২২ সালে। পূর্বাঞ্চলে ৫ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রাণ হারান ১ হাজার বাসিন্দা। আহতের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার। এই ভূমিকম্পটিও মাটির মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীর উৎপত্তি হয়েছিল।

আগের যত ভূমিকম্প
২০২৩ সালে আফগানিস্তানের পশ্চিমের হেরাত প্রদেশে আঘাত হানে ৬ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প। প্রাণ হারান ২ হাজারের বেশি মানুষ। ২০২২ সালের একটি ভূমিকম্পে নিহত ১ হাজার ও আহতের সংখ্যা ছিল দেড় হাজার। ২০১৫ সালে উত্তর-পূর্ব আফগানিস্তানে নিহত হন ২০০ জন। ২০০২ সালে ৬ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্পে ১ হাজার এবং ১৯৯৮ সালে ৬ দশমকি ১ মাত্রার ভূমিকম্প ও পরাঘাতে প্রাণ হারায় সাড়ে চার হাজার মানুষ।

ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে
গৃহযুদ্ধ ও টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এমনিতেও দীর্ঘদিন ধরে বিপর্যস্ত ছিল আফগানিস্তানের জনজীবন, অর্থনীতি। নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশটিকে আরও পিছিয়ে দিচ্ছে। জাতিসংঘের উন্নয়ন সংস্থার (ইউএনডিপি) তথ্য অনুযায়ী, হেরাতে ২০২৩ সালের ভূমিকম্পে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বসতঘর পুরোপুরি ধসে যায়। ১২ হাজার ১০০টি পরিবারের ৬৬ হাজার সদস্য এই ভূকম্পের দ্বারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন। এতে ওই অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। যেগুলো নূন্যতম স্বাভাবিক হতেও কয়েক মাস সময় লাগে।

ভূমিকম্প হলে করণীয়

  • ভূকম্পন অনুভূত হলে আতঙ্কিত হবেন না।
  • ভূকম্পনের সময় বিছানায় থাকলে বালিশ দিয়ে মাথা ঢেকে টেবিল, ডেস্ক বা শক্ত কোনো আসবাবের নিচে আশ্রয় নিন।
  • রান্নাঘরে থাকলে গ্যাসের চুলা বন্ধ করে দ্রুত বেরিয়ে আসুন।
  • বিম, কলাম ও পিলার ঘেঁষে আশ্রয় নিন।
  • শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকলে স্কুলব্যাগ মাথায় দিয়ে শক্ত বেঞ্চ অথবা টেবিলের নিচে আশ্রয় নিন।
  • ঘরের বাইরে থাকলে গাছ, উঁচু বাড়ি, বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে দূরে খোলা স্থানে আশ্রয় নিন।
  • পোশাক কারখানা, হাসপাতাল, বিপণীবিতান ও সিনেমা হলে থাকলে বের হওয়ার জন্য দরজার সামনে ভিড় কিংবা ধাক্কাধাক্কি না করে দুহাতে মাথা ঢেকে বসে পড়ুন।
  • ভাঙা দেয়ালের নিচে চাপা পড়লে বেশি নড়াচড়ার চেষ্টা করবেন না। কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে রাখুন, যাতে ধুলাবালু শ্বাসনালিতে না ঢোকে।
  • একবার কম্পন হওয়ার পর আবারও কম্পন হতে পারে। তাই সুযোগ বুঝে বের হয়ে খালি জায়গায় আশ্রয় নিন।
  • ভবনের ওপর তলায় থাকলে কম্পনা না থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। লাফ দিয়ে বা লিফট ব্যবহার করে নামা থেকে বিরত থাকুন।
  • গাড়িতে থাকলে পদচারী সেতু, উড়ালসড়ক, গাছ ও বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে দূরে গাড়ি থামান। ভূকম্পন না থামা পর্যন্ত গাড়ির ভেতরে থাকুন।

Viewed 4000 times

Spread the news
Copyright © All rights reserved. | Newsphere by AF themes.
error: Content is protected !!