May 14, 2026

Daily Amar Vasha

উত্তর জনপদে সত্য প্রকাশে দৃঢ়

নির্বাচনকে সংশয়ে রাখার ‘সুযোগ’ আর নেই

ডেস্ক রিপোর্ট : নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণার পর এ নিয়ে সংশয়ের হেতু নেই। তারপরও সংশয়পূর্ণ বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। মাঠে থাকা প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ও সমমনারা বাদে বলতে গেলে সব দল নানাভাবে যুক্ত এ প্রক্রিয়ায়। এমনটিও বলা হচ্ছে, তাদের শর্ত পূরণ ছাড়া নির্বাচন ‘হতে দেওয়া হবে না’!

শেখ হাসিনা সরকারের আমলে গ্রহণযোগ্য কোনো নির্বাচন হয়নি। এ ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের কি কোনো বিকল্প রয়েছে? জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ বাদে সব রাজনৈতিক দলের সমর্থনে দায়িত্ব নিয়েছিল। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমেই তাদের ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যেই সেটি সম্পন্ন হতে পারত। তবে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে দায়িত্ব গ্রহণ করায় এ কাজে তাদের দেরি হয়। জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার ও রাষ্ট্র সংস্কার বড় এজেন্ডা হিসেবে সামনে আসাতেও নির্বাচনের সময়সীমা নির্ধারণ সহজ ছিল না। রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐকমত্যে আনাটাও জরুরি ছিল।

ফেব্রুয়ারিতে, রোজার আগে নির্বাচন অনুষ্ঠানে এক ধরনের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয় ক্রমে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম বার্ষিকীতে নির্বাচনের সময়সীমা বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণাটিও ছিল প্রত্যাশিত।রাজনীতির কোনো পক্ষই এটিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেনি। বেসরকারি খাত স্বভাবতই একে স্বাগত জানিয়েছে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেও ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনে সরকারকে সহায়তা জোগানোর কথা বলা হয়েছিল। কক্সবাজারে রোহিঙ্গাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টা জোর দিয়ে বললেন, ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন আয়োজনে দেশ প্রস্তুত।
নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণার ফলে রাজনীতি নির্বাচনমুখী হওয়ার কথা। জনআস্থা বাড়ার কথা গণতন্ত্রে উত্তরণে। গণঅভ্যুত্থানের পর যে পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে গণতন্ত্রে উত্তরণের তো বিকল্প নেই। শ্রীলঙ্কায় একটি নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান হওয়ার পর সেখানেও অন্তর্বর্তী সরকারকে নির্বাচন আয়োজন করতে হয়েছে। তাতে ঘটেছে পরিস্থিতির গুণগত উত্তরণ। বাংলাদেশেও এটি ঘটবে বলে আশা।

নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে মিলবে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত নির্দেশনা। তার এক ধরনের জবাবদিহিও থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সেটি যথাসম্ভব বাড়ানোর আয়োজনও চলছে। সংস্কার আলোচনা চলমান। মৌলিক কিছু সংস্কারেও রাজনৈতিক দলগুলো একমত। তার ভিত্তিতে জুলাই সনদ চূড়ান্তকরণের কাজ চলমান। এর বাস্তবায়ন পদ্ধতিও স্থির করা হবে। এমন অগ্রগতিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।

যেসব প্রশ্নে ঐকমত্য হয়নি, সেগুলোকে ‘ইস্যু’
করে নির্বাচন বিষয়ে সংশয় বাড়িয়ে তোলাও কাজের কথা নয়। এটি বরং জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলে বিবেচিত হবে।
রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে উচ্চারিত অনেকের বক্তব্যে তেমন চেষ্টা রয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দু-তিনটি দল একই লক্ষ্যে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে বললে ভুল হবে না। কেউ বলছে, বিচার ও সংস্কার সম্পন্ন না করে নির্বাচন নয়। সেটিকে কিছুটা পরিমার্জিত করে অন্য কেউ হয়তো বলছে, এসব ক্ষেত্রে ‘দৃশ্যমান অগ্রগতি’ হতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকেও মাঝে এ ক্ষেত্রে ‘পর্যাপ্ত অগ্রগতি’র শর্ত দেওয়া হয়েছিল। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণার মুহূর্তে অবশ্য ওই প্রশ্ন আর তোলা হয়নি।

ইতোমধ্যে সংস্কার-সংক্রান্ত জুলাই সনদের চিত্রটিও স্পষ্ট। ঠিক এ মুহূর্তে আবার কোনো কোনো মহল থেকে বলা হচ্ছে, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দেওয়া না হলে নির্বাচন হবে না। ‘গণভোট’ আয়োজনের কথাও তুলছেন কেউ কেউ। কেউ কেউ আবার বলছেন, ডিসেম্বরেও নির্বাচন হতে পারে–যদি একই সঙ্গে ‘গণপরিষদ নির্বাচন’ হয়। জাতীয় সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন বিষয়ে ঐকমত্য হওয়ার পর কোনো কোনো পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, উভয় কক্ষেই নির্বাচন হতে হবে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) মেনে। এটি মানা না হলে নির্বাচন নাকি প্রতিহত করা হবে!
সংস্কার আলোচনার শুরুতে সরকার বলেছিল, রাজনৈতিক ঐকমত্য হলেই তারা সংস্কারে এগিয়ে যাবে। সব সংস্কার বর্তমান সরকারই বাস্তবায়ন করবে, তাও নয়। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে, ততই এটি প্রতীয়মান– গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছোট কিছু দল চাপিয়ে দিতে চাইছে তাদের পছন্দমতো সংস্কার। একটি সময় পর্যন্ত সরকারের ওপর বেশি প্রভাব থাকায় তারা বিচার ও সংস্কারের শর্তে বেঁধে রাখতে পেরেছিল নির্বাচনের দাবি। কোনো কোনো মহল স্থানীয় নির্বাচনকে জাতীয় নির্বাচনের পূর্বশর্ত করে রাখার প্রচারণায়ও এগিয়ে গিয়েছিল।

অন্তর্বর্তী সরকারকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রেখে পছন্দমতো সব সংস্কার তাকে দিয়ে বাস্তবায়নের তত্ত্বও বাজারে ছাড়া হয়। ‘বিপ্লবী সরকার’ গঠন করে দেশ পরিচালনার তত্ত্বও জোগানো হয় অতিউৎসাহী মহল থেকে। ভালো যে, এসব হালে পানি পায়নি। দেরিতে হলেও প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনকে মুক্ত করেছেন সব পূর্বশর্ত থেকে। তাঁর হাতে এখনও যেটুকু সময় রয়েছে, তাতে অবশ্য নির্বাচন আয়োজনের পাশাপাশি সংস্কার এগিয়ে নেওয়া যাবে। বিচার এগিয়ে নিতেও বাধা নেই। সে কাজে সরকারকে সর্বান্তঃকরণে সহায়তা জোগানোই সবার দায়িত্ব। এর বদলে পুরোনো কথা সামনে এনে কিংবা নতুন শর্ত আরোপ করে নির্বাচনের ব্যাপারে জনমনে সংশয় বাড়ানো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশনা পেয়ে নির্বাচন কমিশনও (ইসি) কাজ শুরু করেছে। নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা মাঠ প্রশাসনেও শুরু হয়েছে রদবদল। পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর নির্বাচনী প্রশিক্ষণের উদ্যোগ রয়েছে। দ্রুত ব্যারাকে ফিরতে ইচ্ছুক সেনাবাহিনীকে নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে। এ অবস্থায় নির্বাচন নিয়ে সংশয় তৈরির মতো বক্তব্য প্রদানের সুযোগ রয়েছে কি?

নির্বাচনে অংশগ্রহণে কোনো পক্ষের বিশেষ অসুবিধা থাকলে তারা এতে অংশ না নিতেই পারে। এর পরবর্তী নির্বাচন হতে পারে তাদের লক্ষ্য। নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করেও রাজনীতিতে কারও কারও অংশগ্রহণ হতে পারে গুরুত্ববহ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জাগ্রত নাগরিক সমাজও বড় ভূমিকা রাখে, যারা হয়তো কখনোই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে না। তাদের কোনো কোনো অংশ অবশ্য অনির্বাচিত সরকারের দীর্ঘস্থায়িত্বে বিশ্বাসী!

অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর বেশি প্রভাব রাখা কোনো কোনো দল নাকি সেটিকে প্রলম্বিত করতে চাইছে নির্বাচন-পরবর্তী অধ্যায়েও। এ জন্যই তারা পিআর পদ্ধতিতে অনেক বেশি সংসদীয় আসন পেতে ব্যগ্র। তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সঙ্গে দরকষাকষিতে বিশেষ সুবিধা হবে তাদের। রাজনীতিতে প্রভাব বাড়বে। এই দাবি না মানলে নির্বাচন বর্জন করে সেটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টায়ও নাকি তারা রয়েছে। আরেক পক্ষ ‘আসন সমঝোতা’র ভিত্তিতে নির্বাচন বিষয়ে তাদের আপত্তি সরিয়ে নিতে রাজি বলে শোনা যায়।
রাজনীতিতে এসব ‘কৌশল’ রয়েছে বৈ কি। সেটি ঘিরে গণতন্ত্রে উত্তরণে সংকট দেখা দেওয়াটা বিপজ্জনক। গণঅভ্যুত্থানের পর সংস্কার প্রয়োজন; তবে নির্বাচন জরুরি। নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার কর্তব্যও রয়েছে। সেই সরকারকে ‘বিশ্বাস’ করার প্রয়োজন নেই। নির্বাচিত সরকার থেকে জনগণকে বঞ্চিতও রাখা যাবে না। তাকে জবাবদিহিতে রাখতে সংসদে প্রকৃত বিরোধী দল থাকাও গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত। এটি পূরণে সংস্কার প্রশ্নে কাছাকাছি অবস্থানে থাকা দলগুলো জোট বেঁধেও নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। সেটি বরং গণতন্ত্রসম্মত। কিন্তু মুখে গণতন্ত্র মেনে নির্বাচন আয়োজনের বিরোধিতা গ্রহণযোগ্য হবে না।

হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক

Viewed 4350 times

Spread the news
Copyright © All rights reserved. | Newsphere by AF themes.
error: Content is protected !!