মাদকের ভয়াল থাবায় যুব সমাজঃএই দায় কার!?
সম্পাদকীয়ঃ তরুণ প্রজন্মই একটি দেশের মূল চালিকাশক্তি এবং ভবিষ্যতের মেরুদণ্ড। কিন্তু বর্তমানে আমাদের এই অমিত সম্ভাবনাময় যুব সমাজ এক চরম সংকটের মুখোমুখি। আর সেই সংকটের নাম ‘মাদক’। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—টেবিল টক থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের চায়ের দোকান, সর্বত্রই আজ মাদকের সর্বগ্রাসী রূপ নিয়ে আলোচনা-উদ্বেগ। ইয়াবা, আইস, ফেনসিডিল, হেরোইন আর নিত্যনতুন সিন্থেটিক মাদকের বিষাক্ত ছোবলে প্রতিদিন ধ্বংস হচ্ছে হাজারো তরুণের স্বপ্ন, তছনছ হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য পরিবার। প্রশ্ন উঠেছে—এই ভয়াবহ পরিণতির দায় আসলে কার?
বিজ্ঞাপন
প্রথমেই আঙুল ওঠে পরিবার ও অভিভাবকত্বের দিকে। আধুনিক প্রতিযোগিতাপূর্ণ জীবনে অনেক মা-বাবাই সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না। পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়ায় এবং নৈতিক শিক্ষার অভাবে অনেক তরুণ একাকীত্ব ও হতাশায় ভুগছে, যা তাদের মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সন্তানের অস্বাভাবিক আচরণ, হঠাৎ খরচের আধিক্য বা সঙ্গ পরিবর্তনের দিকে নজর না রাখার দায় পরিবার এড়াতে পারে না।
বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সীমান্ত নজরদারির ঘাটতি স্পষ্ট। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ মাদকের অন্যতম ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সীমান্ত গলে কীভাবে কোটি কোটি টাকার মাদক দেশে ঢুকছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। মাঝে মাঝে খুচরা বিক্রেতা বা বাহক ধরা পড়লেও, পর্দার আড়ালের মূল ‘মাদক সম্রাট’ বা গডফাদাররা প্রায়শই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং দুর্নীতির মূলোৎপাটন না করতে পারা প্রশাসনের একটি বড় ব্যর্থতা।
বিজ্ঞাপন
তৃতীয়ত, সামাজিক অবক্ষয় এবং সুস্থ বিনোদনের অভাব যুব সমাজকে বিপথগামী করছে। খেলার মাঠের অভাব, পাড়া-মহল্লায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অনুপস্থিতি এবং ইন্টারনেটের অপব্যবহার তরুণদের এক কৃত্রিম ও অন্ধকার জগতে নিমজ্জিত করছে। এছাড়া, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে তৈরি হওয়া চরম হতাশা অনেক শিক্ষিত তরুণকেও মাদকের পথে চালিত করছে।
মাদকের এই ভয়াল থাবা থেকে যুব সমাজকে রক্ষা করতে হলে ব্লেম-গেম বা একে অপরের ওপর দায় চাপানোর সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। এটি কোনো একক ব্যক্তি বা সংস্থার পক্ষে দূর করা সম্ভব নয়।
বিজ্ঞাপন

মা-বাবাকে সন্তানের বন্ধু হতে হবে, তাদের কার্যকলাপে নজর রাখতে হবে এবং নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে।প্রশাসনকে মাদকের সিন্ডিকেট ও গডফাদারদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কঠোর অভিযান চালাতে হবে। সীমান্তে নিরাপত্তা দ্বিগুণ করতে হবে।
যুব সমাজের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
বিজ্ঞাপন

যুব সমাজকে মাদকের অন্ধকার থেকে আলোতে ফিরিয়ে আনা শুধু সময়ের দাবিই নয়,আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবার—সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে সম্মিলিতভাবে এই মরণব্যাধির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। তবেই রক্ষা পাবে আমাদের আগামী প্রজন্ম, সার্থক হবে একটি সমৃদ্ধ দেশ গড়ার স্বপ্ন।
(সংগৃহীত এবং সংযোজিত)
Viewed 11750 times