সুরক্ষার হাতিয়ার যখন প্রতিহিংসার অস্ত্র: নারী আইনের অপব্যবহার রোধে চাই কঠোর নজরদারি
সম্পাদকীয়ঃ
একটি সভ্য ও সাম্যভিত্তিক সমাজ গঠনে নারীর আইনি সুরক্ষা অপরিহার্য। বাংলাদেশে যুগ যুগ ধরে চলে আসা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য এবং সহিংসতা রোধে রাষ্ট্র বিভিন্ন সময়ে অত্যন্ত কঠোর ও যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করেছে। সন্দেহাতীতভাবে এই আইনগুলো বহু নির্যাতিত নারীর পাশে দাঁড়িয়েছে এবং অপরাধীদের শাস্তির মুখোমুখি করেছে। তবে মুদ্রার অপর পিঠের মতো উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই আইনগুলোর ক্রমবর্ধমান অপব্যবহার। সুরক্ষার জন্য তৈরি আইনি ঢাল আজ অনেক ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে হেনস্তা করার ধারালো তলোয়ারে পরিণত হচ্ছে।
আদালত ও বিচারিক খাতের বিভিন্ন প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালগুলোতে দায়ের হওয়া মামলার একটি বড় অংশই পরবর্তী সময়ে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়। বিশেষ করে পারিবারিক কলহ, বিবাহবিচ্ছেদ, দেনমোহর নিয়ে দরকষাকষি, জমিজমা সংক্রান্ত শত্রুতা কিংবা সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরে প্রতিপক্ষের পুরুষ ও তার পুরো পরিবারকে (যেখানে অনেক সময় পরিবারের অন্য নারীরাও অন্তর্ভুক্ত থাকেন) আসামি করে মামলা করার প্রবণতা বাড়ছে।
যখন একের পর এক মিথ্যা মামলা সামনে আসে, তখন সমাজ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রকৃত ভুক্তভোগী নারীদের অভিযোগের প্রতি এক ধরণের অনীহা বা সন্দেহের চোখ তৈরি হয়। ফলে সমাজ ও আদালতের কাছে প্রকৃত নির্যাতিত নারীদের বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটে পড়ে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলাগুলো মূলত অ-জামিনযোগ্য হওয়ায়, প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই অনেক সময় নির্দোষ ব্যক্তিদের দীর্ঘ সময় জেল খাটতে হয়, যা মানুষের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।
ট্রাইব্যুনালগুলোতে হাজার হাজার মিথ্যা মামলার পাহাড় জমে থাকায় প্রকৃত গুরুতর অপরাধের (যেমন- ধর্ষণ বা গুরুতর শারীরিক নির্যাতন) বিচার প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
এই আইনের অপব্যবহারের পেছনে মূল কারণ হলো প্রাথমিক তদন্তে ঘাটতি এবং জবাবদিহিতার অভাব। অনেক ক্ষেত্রে থানায় অভিযোগ পাওয়ার পর বা মামলা করার আগে ঘটনার সত্যতা গভীরভাবে যাচাই করা হয় না। এছাড়াও, মিথ্যা মামলা দায়েরকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার যে বিধান রয়েছে, তার প্রয়োগ নেই বললেই চলে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খোঁজা জরুরি। আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে, তবে তা যেন কারও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার মাধ্যম না হয়। প্রথমত, কোনো মামলা দায়েরের পর পুলিশকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার আগে নিরপেক্ষ ও নিবিড় প্রাথমিক তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কোনো মামলা আদালত কর্তৃক সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রমাণিত হলে, মিথ্যা মামলাকারীর বিরুদ্ধে কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আবশ্যক।
আইন কখনো একপাক্ষিক নিপীড়নের হাতিয়ার হতে পারে না। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই যেখানে কোনো প্রকৃত নির্যাতিত নারী আইনি প্রতিকার থেকে বঞ্চিত হবেন না, আবার কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকেও মিথ্যা মামলার বলি হয়ে সামাজিক ও মানসিকভাবে ধ্বংস হতে হবে না। আইনি ব্যবস্থার মর্যাদা রক্ষা এবং একটি সুষম সমাজ বিনির্মাণে আইনের এই অপব্যবহার কঠোরভাবে রোধ করার এখনই সময়।
Viewed 400 times




