March 12, 2026

Daily Amar Vasha

উত্তর জনপদে সত্য প্রকাশে দৃঢ়

মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব ঘাটতি মোকাবেলা বাজেটে বড় চ্যালেঞ্জঃসিপিডি

অর্থনীতি ডেস্ক রিপোর্টঃ বহুমুখী চাপে পড়বে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। এরমধ্যে রয়েছে—উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন অন্যতম। পরিস্থিতি মোকাবেলায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বাস্তব পদক্ষেপ, রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে জোর দিতে হবে।

 

আগামী অর্থবছরের বাজেট নিয়ে বেসরকারি গবেষণা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) মিডিয়া ব্রিফিংয়ে মঙ্গলবার এসব কথা বলা হয়। রাজধানীর ধানমন্ডির নিজস্ব কার্যালয়ে এই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে সিপিডি।

 

এতে বক্তব্য রাখেন সংস্থাটির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান। মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

 

 

মূলপ্রবন্ধে বলা হয়, নতুন সরকারের প্রথম বাজেট এমন এক সময়ে প্রণয়ন করা হচ্ছে যখন দেশের অর্থনীতি একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ, অন্যদিকে কম রাজস্ব আদায় ও বিনিয়োগ সংকটের মতো চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এ চাপ মোকাবেলায় বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতির আশঙ্কা: সিপিডির বিশ্লেষণে বলা হয়— চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। অথচ পুরো অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এই সময়ে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে অর্থবছরের বাকি সময়ে কর আদায় প্রায় ৫৯ শতাংশ বাড়াতে হবে। বাস্তবে অর্জন করা কঠিন।

 

উন্নয়ন ব্যয় বাস্তবায়নে ধীরগতি: উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও ধীরগতি দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার মাত্র ২০ দশমিক ৩ শতাংশ, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিন্ম।

 

সিপিডির মতে, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং কিছু বড় প্রকল্পের ব্যয় সীমিত করার সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে এডিপি বাস্তবায়নের গতি কমেছে।

 

এদিকে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে সরকার ব্যাংক থেকে প্রায় ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

 

মূল্যস্ফীতির চাপ কমছে না: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হয়েছে।

 

বৈদেশিক খাতে মিশ্র চিত্র: বৈদেশিক খাতে মিশ্র পরিস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রপ্তানি আয়ে প্রায় ৩ দশমিক ২ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে একইসময়ে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ার কারণে বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারও তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।

 

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কর কমানোর সুপারিশ: জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর কমানোর সুপারিশ করেছে সিপিডি। সৌর প্যানেল, বায়ু টারবাইন এবং ব্যাটারি স্টোরেজের মতো পণ্যের ওপর বিদ্যমান শুল্ক ও কর কমালে এখাতে বিনিয়োগ বাড়বে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

 

এ কারণে এসব পণ্যের ওপর কাস্টমস ডিউটি সর্বোচ্চ ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

 

তামাকজাত পণ্যে কর বাড়ানোর প্রস্তাব: জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাকজাত পণ্যের ওপর কর বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সিপিডি। প্রস্তাব অনুযায়ী সিগারেট, বিড়ি, জর্দা ও গুলের ওপর স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ এবং ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া জর্দা ও গুলের ওপর প্রতি গ্রামে ৬ টাকা নির্দিষ্ট আবগারি শুল্ক আরোপেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

 

কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষায় জোর: প্রতিবেদনে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, সার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং খাল পুনঃখননের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি শক্তিশালী করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘ফার্মার কার্ড’ কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়েছে।

 

এছাড়া শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা সহায়তা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি কর্মসূচি সম্প্রসারণের কথাও বলা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, কার্যকর রাজস্ব সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। আসন্ন বাজেটে এসব বিষয় গুরুত্ব পেলে তা অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Viewed 1000 times

Spread the news
Copyright © All rights reserved. | Newsphere by AF themes.
error: Content is protected !!