May 9, 2026

Daily Amar Vasha

উত্তর জনপদে সত্য প্রকাশে দৃঢ়

শতবর্ষে আরএসএস: ভারতের রাজনীতিতে উগ্র হিন্দুত্বের দখল

ডেস্ক রিপোর্ট : ভারতের মধ্যাঞ্চলে বাঁশের লাঠি হাতে, দেশাত্মবোধক সঙ্গীত গেয়ে হাজারো ইউনিফর্ম পরিহিত ব্যক্তি শোভাযাত্রা করছে—দৃশ্যটি দেশটির হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) বিশাল শক্তি প্রদর্শনের প্রতীক।

‘ন্যাশনাল ভলান্টিয়ার অর্গানাইজেশন’ নামেও পরিচিত আরএসএস এ মাসে মহারাষ্ট্রের নাগপুরে তাদের সদর দপ্তরে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শতবর্ষ উদযাপন করেছে।

এএফপি-কে দেওয়া বিরল এক প্রবেশাধিকারে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র আদর্শিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি এই আরএসএস। ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটি আজও ভারতের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব রাখে।

নাগপুরের অনুষ্ঠানে সাদা শার্ট, বাদামি প্যান্ট ও কালো টুপি পরিহিত আরএসএস কর্মীরা বাঁশি ও নির্দেশের ছন্দে পদযাত্রা, ব্যায়াম ও মুষ্টিযুদ্ধ প্রদর্শন করেন। তারা গান ধরেন— ‘চিরকাল তোমায় প্রণাম করি, প্রিয় মাতৃভূমি! হে হিন্দুর মাতৃভূমি!’ আরও শোনা যায়, ‘আমার জীবন উৎসর্গ হোক তোমার সেবায়।’

ভারতের ১৪০ কোটির জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশই হিন্দু। আরএসএস নিজেদের ‘বিশ্বের বৃহত্তম সংগঠন’ দাবি করে, যদিও সদস্যসংখ্যা প্রকাশ করে না।

তাদের দর্শনের মূল কেন্দ্র ‘হিন্দুত্ব’—যেখানে হিন্দুরা শুধু ধর্মীয় নয়, বরং ভারতের প্রকৃত জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

ইতিহাসবিদ মৃদুলা মুখার্জি বলেন, ‘তারা প্রস্তুত যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধেই লড়তে, যারা তাদের পথে আসবে—তা সংখ্যালঘু, মুসলমান, শিখ, খ্রিস্টান কিংবা ভিন্নমতাবলম্বী হিন্দুই হোক।’

আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত তুলনামূলক নরম ভাষায় বলেন, সংখ্যালঘুরা ‘গ্রহণযোগ্য’, তবে তারা ‘বিভাজন সৃষ্টি করা উচিত নয়’।

সংগঠনের কর্মী অনন্ত পোফালি বলেন, ‘আমাদের তিন প্রজন্ম আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত। এই সংগঠন আমাকে ভারতীয় হিসেবে গর্বিত করেছে।’

বিতর্কিত অতীত

ব্রিটিশ শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত হলেও আরএসএস মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারা থেকে আলাদা ছিল। নেহরু সংগঠনটিকে ‘স্বভাবতই ফ্যাসিবাদী’ বলেছিলেন।

মুখার্জি বলেন, ‘ইউরোপের ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের সঙ্গে আরএসএসের যোগসূত্রের প্রমাণ আর্কাইভে পাওয়া যায়। তারা বলেছিল—যেভাবে নাৎসিরা ইহুদিদের সঙ্গে আচরণ করছে, আমাদের সংখ্যালঘুদের সঙ্গেও তেমন আচরণ করা উচিত।’

১৯৪৭ সালের বিভাজনের সময় সংগঠনটি ছিল এক সশস্ত্র হিন্দু মিলিশিয়া। স্বাধীনতার পর ১৯৪৮ সালে গান্ধী হত্যাকাণ্ডে এক সাবেক আরএসএস সদস্যের সম্পৃক্ততার পর সংগঠনটি প্রায় দুই বছর নিষিদ্ধ ছিল।

এরপর তারা ‘শাখা’ নামে স্থানীয় ইউনিটের মাধ্যমে আবার বিস্তার লাভ করে। বর্তমানে সারাদেশে এমন প্রায় ৮৩ হাজার শাখা, ৫০ হাজারের বেশি বিদ্যালয় ও ১ লাখ ২০ হাজার সামাজিক প্রকল্প পরিচালনার দাবি করে আরএসএস।

নাগপুরের এক শাখা সদস্য অলহাদ সদাচার বলেন, ‘আমাদের শাখা মানুষকে একত্র করে, ইতিবাচক শক্তি দেয়, সমাজে সহযোগিতা শেখায়।’

‘একতাবদ্ধ দেশ’

১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে আরএসএস আবারও রাজনৈতিক মঞ্চে উঠে আসে অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ইস্যুতে। আন্দোলনটি পরিণত হয় সহিংসতায়, এবং সেখানে তৈরি হয় রামমন্দির। ইতিহাসবিদ মুখার্জি বলেন, ‘ওই সময়ই আরএসএস ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়—যা স্পষ্টভাবে মুসলবিরোধী রূপ নেয়।’

২০১৪ সালে মোদির বিজেপি সরকারে আসার পেছনে এই সংগঠনের ভূমিকা ছিল মুখ্য।

মোদি নিজে আরএসএসের সাবেক প্রচারক ছিলেন। সমালোচকরা বলেন, তার নীতিগুলো দেশের প্রায় ২২ কোটি মুসলমানকে প্রান্তিক করছে।

মার্কিনভিত্তিক গবেষক রাকিব হামিদ নায়েক বলেন, ‘মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে সহিংসতা, গণপিটুনি ও ঘৃণামূলক বক্তব্যের পরিমাণ স্পষ্টভাবে বেড়েছে।’

তবে ভাগবত এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আরএসএস কখনও কোনো নৃশংসতার সঙ্গে জড়িত ছিল না। কেউ যদি এমন কিছু করে, আমি তা নিন্দা করি।’

জাতীয়তাবাদী রাজনীতিক স্বপন দাশগুপ্ত বলেন, ‘মোদির আমলে আরএসএস ভারতীয় সমাজকে আরও জাতীয়তাবাদী ও কম পাশ্চাত্যধর্মী পথে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।’

সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবক ভ্যাঙ্কটেশ সোমালওয়ার দাবি করেন, ‘আমরা কেবল ভালো মূল্যবোধ শেখাই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশের জন্য অবদান রাখা—একতাবদ্ধ দেশের জন্য।’

Viewed 4600 times

Spread the news
Copyright © All rights reserved. | Newsphere by AF themes.
error: Content is protected !!