May 12, 2026

Daily Amar Vasha

উত্তর জনপদে সত্য প্রকাশে দৃঢ়

যুক্তরাষ্ট্র কেন ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিচ্ছে না

ডেস্ক রিপোর্ট : ফিলিস্তিন ইস্যুতে শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র দুই রাষ্ট্রের সমাধানকে সমর্থন করে আসছে। অর্থ্যাৎ, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি আলাদা রাস্ট্রের মর্যাদা পাবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেটি বাস্তবায়ন করেনি। গত কয়েক দশকে প্রধান মিত্র দেশগুলো স্বীকৃতি দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বদলাচ্ছে না।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগে জো বাইডেন প্রশাসনও দুই রাষ্ট্র সমাধানের নীতির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। কিন্তু এরপরও ভেটো দিয়ে ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের সদস্য হওয়া থেকে বিরত রেখেছে। তাই প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন অবস্থানের পেছনের কারণ কী? কেন তারা ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছে?

এই অবস্থান বুঝতে ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ও দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি জানা জরুরি। এর আগে জেনে রাখা ভালো, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য ও যারা ভোটো দিতে পারে তাদের মধ্যে চীন, রাশিয়া আগেই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। গতকাল রোববার দিয়েছে যুক্তরাজ্য, আজ দিতে পারে ফ্রান্স। ফলে স্থায়ী সদস্য দেশের মধ্যে এখন কেবল যুক্তরাষ্ট্রই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার বাকি।

শুরু থেকে
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনের নিবন্ধ অনুযায়ী, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অল্প কিছুদিন পর তারা এতে জড়িত হয়। ১৯৪৬ সালে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্র একটি অনুসন্ধান কমিশনে অংশ নেয়, যেখানে প্রস্তাব ওঠে হলোকাস্ট থেকে বেঁচে যাওয়া এক লাখ মানুষকে ফিলিস্তিনে পুনর্বাসন করা হবে। এটি ইহুদি কিংবা আরব- কোনো ধরনের রাষ্ট্রই হবে না।

ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নিয়ে প্যালেস্টাইন পোস্টের খবর। ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নিয়ে প্যালেস্টাইন পোস্টের খবর। ছবি: সংগৃহীত

পরে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা হলে যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বিরোধীতা করে প্রতিবেশী আরব দেশগুলো। ১৯৬৭ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে মিসর, ইরাক, জর্ডান, লেবানন ও সিরিয়ার ৬ দিনের যুদ্ধ হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও জাতিসংঘ মিলে সংঘাত মীমাংসার চেষ্টা করে। কিন্তু ১৯৭৩ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে মিশর-সিরিয়ার ফের সংঘাত শুরু হয়। এতে ইসরায়েল জয়ী হলে আরব দেশগুলো বড় ধরনের মানসিক ধাক্কা খায়। যেটির প্রতিক্রিয়ায় আরব দেশগুলো ইসরায়েলের সমর্থনকারী যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

১৯৭৩ সালের যুদ্ধটি ফিলিস্তিনি আন্দোলনের জন্যও আশীর্বাদ হয়ে আসে। পরের বছর (১৯৭৪) আরব লীগ ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থাকে (পিএলও) ‘ফিলিস্তিনি জনগণের একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। দ্য কনভারসেশনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ডেনিস জেট লিখেছেন, এখানে একটি বিষয় তখনও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সেটি হলো- আরব দেশগুলো ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করলেও, এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ নেয়নি। এর মাধ্যমে সমস্যাটি এক প্রকার জিইয়ে রাখা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ও স্বীকৃতির বাধা
মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত। বিল ক্লিনটন থেকে শুরু করে পরবর্তী সব প্রশাসনই কিছু স্বার্থ সামনে রেখে এগিয়েছে। যেমন- জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ইরানি প্রভাব ঠেকানো, ইসরায়েল ও আরব মিত্রদের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তা সুরক্ষিত করা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং গণতন্ত্র প্রচার করা।

কিন্তু ইসরায়েলের নিরাপত্তা সুরক্ষিত করার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ কী? সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ডেনিস জেট বলছেন, এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো- দেশীয় রাজনীতি।

ইসরায়েলে হামাস হামলা করলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিলে জড়ো হন ইহুদিরা। ২০২৩ সালের অক্টোবরে। ছবি: এএফপি

ইসরায়েলে হামাস হামলা করলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিলে জড়ো হন ইহুদিরা। ২০২৩ সালের অক্টোবরে। ছবি: এএফপি

২০২৪ সালের এপ্রিলে ৮৯ শতাংশ মার্কিন ইহুদি জানান, তারা হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ সমর্থন করেন। মার্কিন ইহুদিরা কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে ব্যাপকভাবে সমর্থন দিয়ে আসছেন। ইসরায়েলকে রক্ষা করা তাদের কাছে এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু এই সমর্থন এক সময় কমে আসতে পারে- এমন শঙ্কায় অনেক বছর আগেই ইসরায়েল বিকল্প পথ খুলে রেখেছে।

ডেনিস জেট বলছেন, এই বিকল্প হিসেবে ইসরায়েল ইভানজেলিক খ্রিস্টানদের দিকে হাত বাড়ায়। যারা রিপাবলিকান পার্টির বড় ভোট ব্যাংক। ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য এখন তাদের অনেকের জন্য ধর্মবিশ্বাসের মতো একটি নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রে সরকার পরিবর্তন হলেও কোনো পক্ষই গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

নিঃসঙ্গ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে আগামীকাল মঙ্গলবার ভাষণ দেবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সিএনএন বলছে, এই ভাষণের সময় গাজা ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অনেকটাই নিঃসঙ্গ থাকবেন। কারণ, ঘনিষ্ঠ মিত্ররাসহ জাতিসংঘের অর্ধেকের বেশি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

গাজা সংকট নিয়ে মিত্র দেশগুলো থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ছবি: এএফপি

গাজা সংকট নিয়ে মিত্র দেশগুলো থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ছবি: এএফপি

প্রায় দুই বছর ধরে চলা এই সংঘাতের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন অন্য দেশগুলো থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচ্ছিন্নতার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ দেখা যাবে নিউ ইয়র্কের স্থানীয় সময় সোমবার। এদিন দুই রাষ্ট্র সমাধান নিয়ে ফ্রান্স ও সৌদি আরব যৌথভাবে একটি সম্মেলনের আয়োজন করবে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া জাতিসংঘের প্রায় অধিকাংশ দেশ অংশ নেবে। এ ছাড়া, এ সম্মেলনেই ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিতে পারেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ।

যুক্তরাষ্ট্র এখনও যে অবস্থানে
সিএনএন বলছে, নেতানিয়াহু প্রশাসনের দৃঢ় সমর্থক হওয়ার অবস্থান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্য সফর করেন। সেখানে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনের সময় ট্রাম্প বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের সঙ্গে এখনো যেসব বিষয়ে মতভেদ আছে, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি সেগুলোর মধ্যে একটি।’ অর্থ্যাৎ, যুক্তরাষ্ট্র এখনো ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে রাজি না।

ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তি দিচ্ছে, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়াটা হামাসকে আরও উসকে দেবে। যা বিপরীতে ইসরায়েলের আগ্রাসী প্রতিক্রিয়া বাড়াবে।

ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে অন্য দেশগুলোর সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিও সতর্ক করে বলেন, এটির কোনো প্রভাব নেই। বরং হামাসকে সাহস জুগিয়ে শান্তি চুক্তির সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে। এটি কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

সম্প্রতি ইসরায়েল সফর করেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিও (মাঝে)। ছবি: এএফপি

সম্প্রতি ইসরায়েল সফর করেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিও (মাঝে)। ছবি: এএফপি

হামাসকে আসলে সাহস দিচ্ছে কারা? এ প্রসঙ্গে ফেরা যাক সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ডেনিস জেটের নিবন্ধে। দ্য কনভারসেশনে তিনি লিখেছেন, ইসরায়েলের বর্তমান সরকার দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে ডানপন্থী। এ অবস্থায় নেতানিয়াহু সমাধানের আলোচনায় বসলে অবিলম্বে তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করা হবে। আর তাই রাষ্ট্র গঠনের আলোচনা এড়াতে নেতানিয়াহু বহু বছর ধরে হামাসকে অর্থায়নের জন্য অন্য দেশগুলোকে উৎসাহ দিয়েছেন। কারণ, নেতানিয়াহু জানেন- ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ যতটা সহজে আলোচনায় বসতে রাজি হবে, হামাস ততটা হবে না।

ফলে জাতিসংঘের অন্য দেশগুলো ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলেও আপাতত গাজায় যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

অন্যদের স্বীকৃতির গুরুত্ব
নিউ ইয়র্ক টাইমসকে আইনজীবী পল রেইখলার বলেছেন, এসব স্বীকৃতি প্রতীকী মনে হলেও এমন ছোট ছোট পদক্ষেপ দুই-রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়নে অবদান রাখবে। চলমান সংকট নিরসনে এটিই এখন একমাত্র পথ।

রোববার ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেন যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীরা। কোলাজ

রোববার ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেন যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীরা। কোলাজ

কানাডার অন্টারিওর কুইন্স ইউনিভার্সিটির আইনের সহযোগী অধ্যাপক ও জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা আর্দি ইমসেইস বলছেন, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে দেশগুলোর ইসরায়েলের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার ভিত্তি তৈরি হচ্ছে। একটি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলে তাদের ইসরায়েলের সঙ্গে থাকা চুক্তিও পর্যালোচনা করতে হবে। যাতে তা ফিলিস্তিনের প্রতি দায়িত্বের লঙ্ঘন না হয়।

অর্থ্যাৎ, স্বীকৃতির মাধ্যমে এক ধরনের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হবে। গাজায় সংঘাত বন্ধে এটি এখন একটি পথ হতে পারে।

Viewed 4350 times

Spread the news
Copyright © All rights reserved. | Newsphere by AF themes.
error: Content is protected !!