ডোপ টেষ্ট কি?কিভাবে,কোথায় পরীক্ষা করা হয় এবং কাদের জন্য প্রযোজ্য!!(১’ম পর্ব)
আশিক সুজনঃ রাষ্ট্রের বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রত্যেকটি নগর,শহর-বন্দর থেকে শুরু করে অযোপাড়া গাঁয়ে’ও এখন হাত বাড়ালেই হাতের নাগালে পৌঁছে যাচ্ছে মাদক।এর ভয়াল থাবা থেকে রেহাই পাচ্ছে না কেউই!!কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে নানান বয়সের সকল শ্রেণী পেশার মানুষ আসক্ত হয়ে পড়ছে মাদকের ভয়াল থাবায়।এই ভয়াল থাবা থেকে সমাজকে রক্ষা করার জন্য সরকার ডোপ টেষ্ট নামক একটি পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছেন।তবে তা পূর্নাঙ্গ রুপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে রক্ষা পেতে পারে আপনার,আমার পরিচিত মুখ,পরিবারের সদস্যদের। কারণ একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি পরিবার,সমাজ,রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট(মাদক গ্রহণ করে কি না সেই পরীক্ষা)বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।এরই মধ্যে সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল বলে জানা গেছে।এমনকি সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট করার প্রক্রিয়াও শুরু করা হবে।তবে অনেকেরই অজানা আসলে কী এই ডোপ টেস্ট।আর কেনই বা করা হয় এই পরীক্ষা।চলুন তবে জেনে নেওয়া যাক ডোপ টেস্ট সম্পর্কিত বিস্তারিত সব তথ্য-
ডোপ টেস্ট কী?
যারা নিয়মিত মাদক বা অ্যালকোহল গ্রহণ করেন তাদের শরীরে ওই নেশাজাতীয় পদার্থের কিছুটা হলেও থেকে যায়। আর সেটি ডোপ টেস্টের মাধ্যমে ধরা পড়ে।কোনো ব্যক্তি আদৌ মাদকাসক্ত কি না তা যাচাইয়ের জন্য যে মেডিকেল পরীক্ষা করা হয় তাকেই ডোপ টেস্ট বলে।
এক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির মূত্র বা রক্ত,আবার কখনো দুটির নমুনা পরীক্ষা করা হয়।মাদক গ্রহণ করা ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শেষ ১ সপ্তাহে মুখের লালার মাধ্যমে,শেষ ২ মাস রক্তের মাধ্যমে, শেষ ১২ মাস বা ১ বছরে চুল পরীক্ষার মাধ্যমে পাওয়া যায় মাদকের নমুনা।
ডোপ টেস্ট কেন ও কাদের জন্য প্রযোজ্য?
বর্তমানে শহর,নগর বন্দরে মাদকাসক্তদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়েই চলছে।কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে সকল শ্রেণী পেশার মানুষ, এমন কি বৃদ্ধ পর্যন্ত সব বয়সীরাই মাদকে আসক্ত হয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে নিজেকে। সমাজের জন্য মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা হুমকির কারণ। বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেএে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি বেশ হুমকির স্বরুপ।এসব কারণেই মূলত ডোপ টেস্ট করানো হয়।এছাড়া আরও যেসব কারণে ডোপ টেস্ট করানো হয়ে থাকে তা হলো-
“মাদকসেবী শনাক্ত করতে,ট্রাফিক আইনের জন্য,খেলোয়াড়দের জন্য,আইনি জটিলতার এড়াতে ও ফরেনসিকের প্রয়োজনে”।
বিভিন্ন সরকারি,আধা-সরকারি,স্বায়ত্তশাসিত,স্থানীয় সরকারি ও বেসরকারি সকল চাকরিতে প্রবেশকালে স্বাস্থ্য পরীক্ষার সঙ্গে মাদক পরীক্ষার সনদ বা ডোপ টেস্টের রিপোর্ট জমা দিতে হয়।আবার চাকরিতে থাকাকালীন কোনো কর্মচারী বা কর্মকর্তার আচরণ সন্দেহজনক হলে যে কোনো সময় তার ডোপ টেস্ট করানোও হতে পারে।
এছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স করার সময় বা নবায়ন করার জন্যও এই পরীক্ষা করানো হয়। নতুন আইন অনুসারে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চাইলেও ডোপ টেস্ট করাতে হবে।একই সঙ্গে শিক্ষা,গবেষণা বা কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশ যেতে চাইলে বাংলাদেশি নাগরিকদের মাদক পরীক্ষার রিপোর্ট জমা দিতে হবে।অস্ত্রের লাইসেন্স করতেও ডোপ টেস্টের রিপোর্ট জমা দিতে হয়।
ডোপ টেস্ট কীভাবে করা হয়?
ইউরিন বা মূত্র পরীক্ষার মাধ্যমে ডোপ টেস্ট করা হয়।কোনো মাদক সেবনের পর মুখের লালা বা থুথু পরীক্ষা করে শনাক্ত করা যায় তার উপস্থিতি।
যেমন- গাজা সেবন করার পরবর্তী ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত মুখের লালা থেকে এই মাদক পদার্থের উপস্থিতি শনাক্ত করা যায় মুখের লালা পরীক্ষা মাধ্যমে।
শরীরে মাদকের কোনো উপস্থিতি আছে কি না তা পরীক্ষার অন্যতম এক উপায় হলো রক্ত পরীক্ষা।আপনার শরীরে রক্ত টেস্টের মাধ্যমে মাদকের উপস্থিতির সঠিক ফলাফল পাওয়া যায়।
ডোপ টেস্টের ক্ষেত্রে চুল পরীক্ষা করার মাধ্যমেও মাদক শনাক্ত করা হয়। যে কোনো মাদক গ্রহণের পরবর্তী ৯০ দিন পরেও চুল পরীক্ষার মাধ্যমে তা ধরা পড়ে সহজেই।ট্রাফিক পুলিশরা সন্দেহজন চালকদের নিঃশ্বাস পরীক্ষার মাধ্যমে মাদক শনাক্ত করেন।অ্যালকোহল ডিটেক্টরের মাধ্যমে এই টেস্ট করা হয়।
ডোপ টেস্টে কোন কোন মাদক ধরা পড়ে?
বাংলাদেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি) এর প্রণীত খসড়া অনুযায়ী ডোপ টেস্টে নির্দিষ্ট কিছু মাদক পরীক্ষা করা হয়।
যেমন- ডায়াজেপাম, লোরাজেপাম, অক্সাজেপাম, টেমাজেপাম, কোডিন, মরফিন, হেরোইন, কোকেন, গাজা, ভাং, চরস, অ্যালকহোল বা মদ, ফেনিসিডিল, ইয়াবা ও এলএসডি।
ডোপ টেস্ট কোথায় করা হয় ও কত খরচ?
সারাদেশের সব সরকারি হাসপাতালে ডোপ টেস্ট করানো যাবে। স্বাস্থ্য অধিদফতর কর্তৃক ডোপ টেস্টের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ ফি ৯০০ টাকা। নন-স্পেসিফিক পরীক্ষা যেমন- বেঞ্জোডায়াজেপিন, এমফেটামাইনস, অপিয়েটস ও কেননাবিনেয়েডস- এই চারটির প্রতিটির ফি ১৫০ টাকা এবং অ্যালকোহল পরীক্ষার ফি ৩০০ টাকা।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের অনুমোদিত ডোপ টেস্টে মহানগরীর হাসপাতালগুলো হলো, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় অর্থপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর) এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল।
এছাড়া বাংলাদেশের বেশ কিছু স্থানে ডোপ টেস্ট শনাক্তকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে- রংপুর, ঢাকা, চট্রগ্রাম, কক্সবাজার, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, রাজশাহী, পাবনা, সিলেট, খুলনা, বগুড়া, গাজীপুর, পটুয়াখালী, ফরিদপুর, নোয়াখালী, কুষ্টিয়া, যশোর, নরসিংদী ও টাঙ্গাইল। এই জেলাগুলোতে ডোপ টেস্টের জন্য মিনিল্যাব বসানো হয়েছে।
ডোপ টেস্ট করার নিয়ম!!
কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করে ডোপ টেস্ট করা হয়। প্রথমে যে ব্যক্তির ডোপ টেস্ট করানো হবে তার পরিচয় জমা নেওয়ার জন্য একটি ফরম পূরণ করতে হবে। সেখানে তার নাম, ঠিকানা, বয়স, জাতীয় পরিচয়পত্র ইত্যাদির তথ্য দেওয়া থাকবে।
ডোপ টেস্টের ফরম পূরণ করার পর নমুনা জমা দিতে হবে। একজন বিসিএস ক্যাডার ডাক্তার দিয়ে ওই নমুনা পরীক্ষা করা হয়। নমুনাতে যে কোনো মাদক ধরা পড়লে ডোপ টেস্টের রিপোর্ট পজিটিভ আসবে। আর ওই ব্যক্তি যদি মাদকাসক্ত না হন তাহলে তার নমুনা পরীক্ষায় ডোপ টেস্টের রিপোর্ট নেগেটিভ আসবে।
“এর পরের পর্বে থাকছে ডোপ টেষ্টের প্রয়োজনীয়তা ,উপকারিতা ও সরকারি চাকুরিজীবী ডোপ টেষ্ট পজেটিভ হলে কি ধরনের শাস্তি প্রদান করা হবে তা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা”।তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মাদকাসক্ত ব্যক্তি শনাক্ত করতে ডোপ টেস্ট করতে একটি বিধিমালা প্রণয়ন করার কথা।কিন্তু ২০১৮ সালে আইন পাস হলেও গত সাত বছরে বিধিমালাটি চূড়ান্ত করা হয়নি।
Viewed 6000 times