ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার দ্রুত কমছে
ডেস্ক রিপোর্ট : বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে ঋণ চাহিদা এখন কম। এর মধ্যে রেমিট্যান্স এবং বিদেশি ঋণ ছাড় বেড়ে যাওয়ার কারণে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। ডলারের দর যাতে বেশি না কমে, তার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনছে। এতে করে বাজারে টাকার সরবরাহ বেড়েছে। এ অবস্থায় উদ্বৃত্ত টাকা ট্রেজারি বিল-বন্ডে অর্থাৎ সরকারকে ঋণ দিতে ব্যাংকের আগ্রহ বেড়েছে। আবার ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগের প্রবণতা যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এর প্রভাবে সরকারি সিকিউরিটিজের সুদহার দ্রুত কমছে। দীর্ঘদিন ১২ শতাংশের ওপরে থাকা সুদহার কমে এখন ১০ শতাংশের ঘরে নেমেছে। এতে করে ব্যাংকের গ্রাহক পর্যায়ে সুদহার কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার পাঁচ হাজার কোটি টাকার ১৪ দিন মেয়াদি বাংলাদেশ ব্যাংক বিলের নিলাম ডাকা হয়। এর বিপরীতে আবেদন পড়ে ১১ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকার। ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ সুদে এ অর্থ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত ৩ জুলাই সুদহার ছিল ১২ শতাংশ। গত ১৭ জুলাই তা ১০ দশমিক ৯৯ শতাংশে নামে। একইভাবে সব ধরনের ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার কমেছে। গত ৪ আগস্ট ৯১ দিন মেয়াদি বিলে সুদহার ১০ দশমিক ২৩ শতাংশে নামে। ১৮২ দিন মেয়াদি বিলে ছিল ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলে ১০ দশমিক ৩৮ শতাংশে নেমেছে। আর গত ৬ আগস্ট দুই বছর মেয়াদি বন্ডের গড় সুদহার নেমেছে ১০ দশমিক ২৬ শতাংশে। গত জুনে ৯১ দিন মেয়াদি বিলে সুদহার ছিল ১১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ১৮২ দিন মেয়াদি বিলে ১১ দশমিক ৯৮ এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলে সুদহার ছিল ১২ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। একইভাবে দুই বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহার ছিল ১২ দশমিক ২০ শতাংশ।
২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংক ঋণে সুদহারের সীমা ৯ শতাংশে নির্ধারিত ছিল। গত বছরের মে মাসে সুদহার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে করে ঋণ ও আমানতের সুদহার বেড়েছে। সমস্যায় থাকা অনেক ব্যাংক এখন মেয়াদি আমানতে ১২ শতাংশের বেশি সুদ দিচ্ছে। ঋণ বিতরণ করছে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ সুদে।
ব্যাংকাররা জানান, উচ্চ সুদ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতি রয়েছে। গত জুন শেষে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৪০ শতাংশে নেমেছে, যা গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে প্রধান অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তারল্য কমানোর জন্য ট্রেজারি বিল এবং বন্ডের বিপরীতে বাজার থেকে টাকা তুলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আগের দায় পরিশোধ করা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি আরও কমানোর জন্য নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত নীতি সুদহারে হাত দেবে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নীতি সুদহার অপরিবর্তিত থাকলেও বাজারে সুদহার কমতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার যেভাবে কমছে, সে তুলনায় ব্যাংকের সুদহারে পরিবর্তন হচ্ছে না। সামনের দিনে দেখা যাবে, বেশি সুদের আশায় আমানতকারীদের অনেকেই ব্যাংকমুখী হচ্ছেন। তখন আমানত প্রবাহ বেড়ে সুদহার কমতে শুরু করবে। এতে ঋণের সুদহারও কমে আসবে। তিনি বলেন, ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার ১২ শতাংশের ওপরে থাকা ছিল অস্বাভাবিক। এখন যা সংশোধন হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছর প্রায় সাড়ে ছয় বিলিয়ন ডলার বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। আবার গত জুনের শেষ সপ্তাহে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি ঋণ যোগ হয়েছে। রপ্তানিতেও ৯ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি রয়েছে। অথচ আমদানি বেড়েছে সাড়ে ৪ শতাংশের মতো। এসব কারণে বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন ভারসাম্যে চার বছর পর উদ্বৃত্ত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ বেড়ে জুন শেষে ৩১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। ডলারের আকস্মিক দর পতন ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিলাম ডেকে চার দফা প্রায় ৫৪ কোটি ডলার কিনে বাজারে ছেড়েছে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে গত ১৩ জুলাই প্রথম ১৭ কোটি ১০ লাখ ডলার কিনে ২ হাজার ৭৮ টাকা ছাড়ার পর থেকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার দ্রুত কমছে।
Viewed 5450 times
