শান্তিচুক্তির সাফল্য নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বোঝার ওপর
ডেস্ক রিপোর্টঃ
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ (সিপিএস), ‘ইন পিস আমর’ এবং কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ রিজাইনার যৌথ উদ্যোগে ‘দ্য স্পেকট্রাম অফ পিস: পিসকিপিং, পিসমেকিং অ্যান্ড পিসবিল্ডিং’ শীর্ষক একটি ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১০ ডিসেম্বর রাতে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিশেষজ্ঞরা সহিংসতা প্রতিরোধ এবং টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় পরিবর্তনশীল ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন।
ওয়েবিনারে মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কোস্টারিকার ইউনিভার্সিটি ফর পিসের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আমর আবদাল্লা। তিনি শান্তিপূর্ণ হস্তক্ষেপের বিভিন্ন মডেল তুলে ধরেন এবং জোর দিয়ে বলেন যে, কার্যকর শান্তি প্রচেষ্টার জন্য চলমান সংঘাত বিশ্লেষণ অত্যন্ত জরুরি। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, ‘কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্ট’ বা সংঘাত ব্যবস্থাপনা সহিংসতা কমায়, ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত নিরসন আলোচনার মাধ্যমে গভীর সমস্যাগুলোর সমাধান করে এবং ‘কনফ্লিক্ট ট্রান্সফরমেশন’ বা সংঘাত রূপান্তর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তন নিশ্চিত করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যুক্ত ছিলেন বেগম খালেদা জিয়ার নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর। সুদানে শান্তিরক্ষা মিশনের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, শান্তি চুক্তির সাফল্য নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বোঝার ওপর। তিনি রিসোর্সে শেয়ারিং এর আলোচনায় প্রাথমিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং সব পক্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি সিপিএস-এর প্রস্তাবিত কোর্সটির প্রশংসা করে বলেন, এটি বাংলাদেশের শান্তি সহায়তা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হবে এবং অংশগ্রহণকারীদের তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বাস্তবায়নযোগ্য নিরাপত্তা কৌশলে রূপান্তর করতে সাহায্য করবে।
সেশনের সভাপতিত্ব করেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল হান্নান চৌধুরী। তিনি শিক্ষাদান ও গবেষণার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকার ওপর জোর দেন। অ্যাঙ্গোলার ১৯৭৫ পরবর্তী দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের উদাহরণ দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন যে, যুদ্ধ কীভাবে সম্পদশালী সমাজকেও ধ্বংস করে দিতে পারে। তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে সম্প্রীতি ও ঐক্য গড়ার লক্ষ্যে অভিজ্ঞদের নির্দেশনায় সিপিএস-কে শান্তি-কেন্দ্রিক পাঠ্যক্রম তৈরির আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ পিস সাপোর্ট অপারেশনস ট্রেনিং (বিআইপিএসওটি)-এর কমান্ড্যান্ট মেজর জেনারেল হুসাইন মুহাম্মাদ মাসীহুর রহমান শান্তিরক্ষা মিশনে ‘জনমুখী দৃষ্টিভঙ্গি’ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের আগে শান্তিরক্ষীদের উচিত মানুষের জীবিকা, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে কাজ করা।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল (অব.) মো. মাঈন উল্লাহ চৌধুরী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদানের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, যখন ম্যান্ডেট বাস্তবসম্মত হয় এবং শান্তিরক্ষীরা ভাষাগত ও সাংস্কৃতিকভাবে প্রস্তুত থাকেন, তখনই শান্তি প্রচেষ্টা সফল হয়।
ওয়েবিনারের সঞ্চালক ও সিপিএস-এর পরিচালক অধ্যাপক এম. জসিম উদ্দিন বলেন, ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে সংঘাত অনিবার্য, তাই সংঘাত বিশ্লেষণের মাধ্যমেই শান্তির সূচনা করতে হবে। তিনি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অবদানকে জাতীয় গর্বের উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন। একইসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, সংঘাত ও হত্যাকাণ্ড অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও জাতিসংঘ ও বৈশ্বিক শক্তিগুলো কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছাই এখানে চূড়ান্ত নির্ধারক।
আলোচনায় আরও অংশ নেন কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ রিজাইনার সহযোগী অধ্যাপক ড. আসাদুল্লাহ। তিনি পরামর্শ দেন যে, সিপিএস ‘উইন্টার পিসবিল্ডিং স্কুল’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার শান্তিরক্ষা সক্ষমতা আরও জোরদার করতে পারে। প্রশ্নোত্তর পর্বে সিপিএস সদস্য ও পিএসএস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. আনসার উদ্দিন আনাস এবং শিক্ষার্থীরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
উল্লেখ্য, সিপিএস উইন্টার পিসবিল্ডিং স্কুল অদূর ভবিষ্যতে তাদের কোর্স কার্যক্রম পরিকল্পনা করছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সংঘাত বিশ্লেষণ, মধ্যস্থতা, শান্তিরক্ষা এবং সংঘাত-পরবর্তী পুনর্গঠন মতো প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ পাবে। টেকসই শান্তি কৌশল প্রণয়নে একাডেমিয়া ও নীতিনির্ধারকদের পারস্পরিক সহযোগিতার আহ্বানের মধ্য দিয়ে ওয়েবিনারটি শেষ হয়।
Viewed 2800 times