April 12, 2026

Daily Amar Vasha

উত্তর জনপদে সত্য প্রকাশে দৃঢ়

অর্থনীতির দুর্দিনে ভালো বাজেটের অপেক্ষা

Online Desk:

আমরা জানি, একটি জাতীয় বাজেট কেবল আর্থিক পরিকল্পনা নয়; এটি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রতিফলনও বটে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট এমন এক সংকটময় সময়ে আসছে, যখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা, আয় ঘাটতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা একসঙ্গে কাজ করছে। এই প্রেক্ষাপটে আসছে বাজেটটিকে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।সমগ্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, জাতীয় পুঁজি বিকাশের জন্য বাজেটটিতে একটি বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখা উপস্থাপন চ্যালেঞ্জ হবে।

এরই মধ্যে রাজস্ব বাড়ানোর কথা জোরালোভাবে বলা হলেও অনেক প্রস্তাবই খাপছাড়া, যেন ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁসকে জবাই করা’। এ ধরনের নীতি দেশের অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিপথ নিশ্চিত করতে পারবে না।

সম্ভাব্য আট লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকার বাজেটের আকার বর্তমান বাস্তবতায় উচ্চাভিলাষী। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা প্রায় ছয় লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, যা মূলত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর নির্ভরশীল।

কিন্তু গত চার অর্থবছরে প্রশাসনিক দুর্বলতা, অস্বচ্ছ করনীতি এবং করদাতাদের আস্থাহীনতার কারণে এনবিআর ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। কর সংগ্রহে প্রযুক্তির ব্যবহার কিংবা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দৃঢ় অঙ্গীকার এখনো দেখা যায় না। বরং মধ্যবিত্ত ও পেশাজীবীদের ওপর করের চাপ বাড়িয়ে তাদের ক্রয়ক্ষমতা আরো কমিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ব্যয় খাতে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) দুই লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখার কথা চলছে।

অবকাঠামো উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবায়ন দুর্বলতা এর কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। এডিপি বাস্তবায়নের হার দীর্ঘদিন ধরে ৬৫ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং প্রকল্প ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি ফুট ওভারব্রিজের ব্যয় ঢাকার অভিজাত এলাকায় চারতলা ভবনের সমান, যা উন্নয়ন ব্যয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

মুদ্রাস্ফীতি এখন সবচেয়ে বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে।

খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশেরও বেশি। নিম্নমধ্যবিত্ত শহুরে পরিবার ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছে। অথচ বাজেটে এ বিষয়ে কোনো সাহসী ও অভিনব উদ্যোগের আলোচনা নেই। নেই নগর রেশনিং ব্যবস্থা, ভর্তুকিযুক্ত গণপরিবহন কিংবা আবাসন সহায়তাও। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বরাদ্দ কিছুটা বাড়লেও মাথাপিছু হিসাবে তা এখনো অপর্যাপ্ত এবং এর গুণগত মান ও সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান—যা অর্থনীতির প্রকৃত চালিকাশক্তি, সেগুলো নিয়ে বাজেটে এ পর্যন্ত আশাবাদী বক্তব্য থাকলেও কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। কর প্রণোদনা ও একক সেবা বা সিঙ্গল উইন্ডো ব্যবস্থার কথা বলা হলেও বিনিয়োগকারীদের বাস্তব সমস্যাগুলো, জমির জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক বাধা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক খাতের তারল্য সংকট অনেক দিন ধরে অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণে বেসরকারি খাত, বিশেষ করে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থপ্রবাহ সংকুচিত করতে পারে। রপ্তানিমুখী খাতে কিছু কর সুবিধা থাকলেও ডলার সংকট ও এলসি জটিলতা বিনিয়োগ নিরুৎসাহ করছে।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের অভাবই সম্ভবত সবচেয়ে বড় ঘাটতি। খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ছয় লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ব্যাংক একীভূতকরণ নিয়ে বিতর্ক চলছে। সুশাসন ঘাটতির খবর শিরোনাম হচ্ছে, তবু কোনো কার্যকর সমাধান নেওয়া হয়নি। অথচ শক্তিশালী ব্যাংকিং খাত ছাড়া অর্থনীতিতে তারল্য ও সুদের হার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব নয়।

বহিঃখাতেও ঝুঁকি রয়ে গেছে। রপ্তানি আয় স্থবির, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখনো ৩০ বিলিয়ন ডলারের নিচে। রেমিট্যান্স কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতা ও অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের কারণে সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট প্রবাসী শ্রমবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—এত বড় ও উচ্চাভিলাষী বাজেট বাস্তবায়ন কিভাবে সম্ভব? বাজেট তখনই সফল হয়, যখন তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। বর্তমানে অর্থনীতি উচ্চমাত্রার সরকারি ঋণ, বেসরকারি খাতে ঋণ সংকোচন, স্থায়ী মূল্যস্ফীতি এবং দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার চাপের মধ্যে রয়েছে।

এই সময়ে বাজেটটি একটি রূপান্তরমূলক দলিল হতে পারত কিংবা এখনো সম্ভাবনা আছে, যেখানে প্রশাসনিক সংস্কার, শৃঙ্খলাবদ্ধ বাস্তবায়ন এবং জন-আস্থা পুনরুদ্ধারের সুস্পষ্ট বার্তা থাকবে। কিন্তু বাস্তবে এটি অনেকটা সংখ্যার সমষ্টি ও প্রতিশ্রুতির তালিকায় পরিণত হয়েছে, যেখানে কাঠামোগত পরিবর্তনের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা হয়তো অনুপস্থিত থেকেই যাবে।

বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কৌশল, যা তথ্যনির্ভর ও বাস্তবমুখী; যেখানে অগ্রাধিকার পাবে বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি, কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা। দারিদ্র্য মোকাবেলায় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বিকল্প নেই। আর তা নিশ্চিত করতে হলে করহার কমিয়ে করের আওতা বাড়াতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন সাহসী নেতৃত্ব, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

মামুন রশীদ : অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ফাইন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান

Viewed 2150 times

Spread the news
Copyright © All rights reserved. | Newsphere by AF themes.
error: Content is protected !!